বিশেষ প্রতিবেদন, সুদীপ্তা ঘোষ, ২৭ জুলাই : ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর, ব্রিটিশ ভারতের মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির রামেশ্বরমের এক তামিল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবুল পাকির জয়নুল আবেদিন আব্দুল কালাম অর্থাৎ আমাদের প্রিয় “ভারতের মিসাইল ম্যান” স্যার আব্দুল কালাম। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল কালাম। তাঁর পিতা রামেশ্বরম ছিলেন একজন নৌকার মালিক এবং মা আশিয়াম্মা ছিলেন সাধারণ গৃহবধু। অল্প বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে চেপে যায়। সেই জন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করার পরেই তিনি তাঁর বাবাকে সাহায্য করার জন্য, সংবাদপত্রে লেখালিখি শুরু করেন।
বিদ্যালয়ে তিনি খুবই সাধারণ মানের ছাত্র হলেও, তাঁর বুদ্ধিদীপ্ততা এবং কঠোর পরিশ্রম সকলের নজর কেড়েছিল। পড়াশোনা করার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা পড়াশোনা করতেন এবং অংক করতেন। তিনি রামনাথপুরাম স্কোয়ার্টজ মেট্রিকুলেশন স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর, তিরুচিরাপল্লী “সেন্ট জোসেফ কলেজে” ভর্তি হন এবং ১৯৫৪ সালে তিনি ওই কলেজ থেকেই ফিজিক্স নিয়ে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি চেন্নাইতে চলে আসেন এবং এখানকার “মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি” থেকে তিনি বিমান প্রযুক্তি নিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি অল্পের জন্য যোদ্ধা পাইলট হওয়ার সুযোগ হারান কারণ ওই পরীক্ষায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর একজন কর্মীর প্রয়োজন ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে কালাম পরীক্ষায় নবম হয়েছিলেন।
তিনি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের একাদশতম রাষ্ট্রপতি ছিলেন তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় একজন বিজ্ঞানী হিসেবে, পরে তিনি ঘটনাচক্রে গণপ্রজাতন্ত্রী ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁর কর্মজীবনের প্রথম ভাগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন অটল বিহারী বাজপাই এবং পরবর্তী কালে প্রধানমন্ত্রী হন মনমোহন সিং। তিনি ২০০২-২০০৭ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভারতের সেবা করেন। তিনি চেন্নাইয়ের মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে পড়াশোনা করার পর ৪০ বছর প্রধানত “রক্ষা অনুসন্ধান ও বিকাশ গণসংগঠন” (DRDO) এবং “ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থাতে”(ISRO) বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞান প্রশাসক হিসেবে কাজ করেন। ভারতের অসামরিক মহাকাশ কর্মসূচির অসামরিক সুসংহত নিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন কর্মসূচির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত ছিলেন। “ব্যালিস্টিক মিসাইল” এবং মহাকাশযান বাহী রকেট উন্নয়নের কাজে তাঁর অবদানের জন্যই তাঁকে “মিসাইল ম্যান অফ ইন্ডিয়া” বলা হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে নিযুক্ত থাকার পর তিনি অবসর নিয়ে নেন এবং শিক্ষাবিদ লেখক এবং জনসেবক হিসেবে নিজের জন্য সাধারণ জীবন বেছে নেন ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মান ও পুরস্কার পেয়েছিলেন কালাম।
২০১৫ সালের ২৭ জুলাই সোমবার, মেঘালয়ের শিলং শহরে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট (IIM) প্রতিষ্ঠানে বসবাস যোগ্য পৃথিবী বিষয়ে বক্তব্য রাখার সময় সন্ধ্যে ৬.৩০ টা নাগাদ তাঁর হৃদপিন্ডে হঠাৎ আঘাত (হার্ট অ্যাটাক) নেমে আসে। তাঁকে স্থানীয় বেথানি হাসপাতলে নিয়ে যাওয়া হলে, সেখানেই সন্ধ্যে ৭.৪৫ নাগাদ তাঁর মৃত্যু হয়। আব্দুল কালাম এর মৃতদেহ ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে শিলং থেকে গোয়াহাটি নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে একটি সি-১৩০ হারকিউলিস বিমানে নতুন দিল্লির পালাম বিমানঘাঁটিতে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং তিন বাহিনীর প্রধান কালামের মরদেহে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এছাড়াও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব, চতুর্দশ দলাই লামা সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। ভারত সরকার তাঁর মৃত্যুর পর সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা করেন। কালামের মৃত্যুতে দেশের বিজ্ঞান জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়। চতুর্দশ দলাই লামা কালামের মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন, “কালাম শুধুমাত্র একজন বৈজ্ঞানিক শিক্ষাবিদ রাষ্ট্রনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিপাট ভদ্রলোক, সরল ও বিনয়ী।”







