মণিরাজ ঘোষ, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১১ আগস্ট : “ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান” গেয়ে যাওয়া ১৮ বছরের এক কিশোর’কে মৃত্যুঞ্জয়ী বীর রূপেই ইতিহাস মনে রাখে। মেদিনীপুরের মৃত্যুঞ্জয়ী সন্তান ক্ষুদিরাম বসু’র (জ: ১৮৮৯ এর ৩ ডিসেম্বর) আজ ১১৩ তম (মৃ: ১৯০৮ এর ১১ আগস্ট) আত্মবলিদান দিবস। মাত্র ১২-১৩ বছর বয়সেই (১৯০২-‘০৩) স্বাধীনতার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অনুশীলন সমিতি থেকে শুরু করে বারীন্দ্রনাথ ঘোষের প্রশিক্ষণে বোমা তৈরীর কৌশল রপ্ত করা, সবকিছুতেই ক্ষুদিরামের উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছিল অবর্ণনীয়। তাই, মাত্র ১৮ বছরের এক কিশোর প্রফুল্ল চাকী (১৯ বছর)’র সঙ্গে জুটি বেঁধে, অত্যাচারী কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন (১৯০৮ এর ৩০ এপ্রিল)। ভারতমাতার দুর্ভাগ্য তাঁর বীর সন্তানেরা সে যাত্রায় সফল হতে পারেননি, বরং দেশমাতৃকা হারিয়েছিল, তাঁর দুই কিশোর সন্তানকে। ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়ার আগেই প্রফুল্ল চাকী (১৯০৮ এর ২ মে) গুলি করে নিজেকে শেষ করে দিয়েছিলেন (যদিও, বর্তমানে অনেক ঐতিহাসিক বলছেন প্রফুল্ল চাকী কেউ নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল ব্রিটিশরা)। আর এক কিশোর, ক্ষুদিরামও ধরা পড়ে যান, ১৯০৮ এর ১ লা মে।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী (উইকিপিডিয়া), ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল নিজেদের রাস্তায় পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন। মধ্যরাতের মধ্যে সারা শহর ঘটনাটা জেনে যায় এবং খুব সকাল থেকেই সমস্ত রেলস্টেশনে সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা
হয়েছিল যাতে প্রত্যেক যাত্রীর ওপর নজর রাখা যায়। সকাল পর্যন্ত ক্ষুদিরাম ২৫ মাইল পায়ে হেঁটে ওয়াইনি নামে এক স্টেশনে পৌঁছন। যখন একটা চায়ের দোকানে তিনি এক গ্লাস জল চেয়েছিলেন, তখন তিনি ফতে সিং এবং শিউ প্রসাদ সিং
(কি দুর্ভাগ্যজনক! দুই বিশ্বাসঘাতক ভারতীয়দের হাতে বন্দী হচ্ছেন ভারতমাতার এক বীর সন্তান!) নামে দু’জন কনস্টেবলের মুখোমুখি হন, যারা তার ময়লা পা এবং বিধ্বস্ত ও ঘর্মাক্ত চেহারা দেখে কিছু সন্দেহ করেছিল। কয়েকটা
প্রশ্ন করার পর তাদের সন্দেহ বেড়ে যায় এবং তারা ক্ষুদিরামকে আটক করার সিদ্ধান্ত নেয়। ক্ষুদিরাম তাদের দুজনের সঙ্গে সংগ্রাম শুরু করে এবং তৎক্ষণাৎ দুটো রিভলভারের একটা পড়ে যায়। অন্য রিভলভারটা দিয়ে কনস্টেবলদেরকে গুলি
করতে উদ্যত হওয়ার আগেই কনস্টেবলদের একজন ক্ষুদিরামকে পিছন দিক থেকে মজবুত আলিঙ্গনাবদ্ধ করে ধরে ফেলে। নবীনতর এবং হালকা চেহারার ক্ষুদিরামের পক্ষে নিজের প্রতিরক্ষা অথবা অব্যাহতি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিলনা। তার কাছে
৩৭ রাউন্ড গোলাগুলি, ৩০ টাকা নগদ, একটা রেলপথের মানচিত্র এবং একপাতা রেলের সময়সারণি ছিল। ক্ষুদিরাম চিরকালের জন্যে ধরা পড়ে গেলেন! ওয়াইনি রেল স্টেশনটা বর্তমানে নাম বদল করে হয়েছে ক্ষুদিরাম বোস পুসা স্টেশন। অত্যন্ত
প্রাসঙ্গিক যে, প্রফুল্ল চাকী’ কেউ ১৯০৮ এর ২ মে যে পুলিশ অফিসার আটক করেছিলেন, তিনিও এক বাঙালি তথা ভারতীয়ই ছিলেন (নন্দলাল ব্যানার্জি)! শুধুমাত্র এই কারণেই ভারতমাতা’কে ২০০ বছরের শৃঙ্খল বরণ করে নিতে হয়েছিল!
যাইহোক, ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ভারতমাতার কনিষ্ঠতম শহীদ ক্ষুদিরাম বসু’র ফাঁসির নির্দেশ কার্যকরী হয়। ১৯০৮ এর ১১ আগস্ট মাত্র ১৮ বছর ৮ মাস ৮ দিনের মাথায়, ভোর সাড়ে চারটা নাগাদ হাসতে হাসতে ‘ফাঁসির
দড়ি’ গলায় পরে স্বাধীনতার জয়গান গেয়েছিলেন মেদিনীপুরের ক্ষুদিরাম, মোহবনীর ক্ষুদিরাম।
ক্ষুদিরামের ১১৩ তম আত্মবলিদান দিবসে, অবিভক্ত মেদিনীপুরের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক সংগঠন ‘মিডনাপুর ডট ইন’ এর সদস্যরা ভোর সাড়ে চারটাতেই মেদিনীপুর শহরে ক্ষুদিরামের সকল মর্মর মূর্তি’তে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা
জ্ঞাপন করেন। সংগঠনের পক্ষে অরিন্দম ভৌমিক বলেন, “এই দিনটিতে আমরা মুজাফফরপুরে গিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে থাকি, কিন্তু মহামারীর প্রাদুর্ভাবে এ বছর তা হলনা! মেদিনীপুরে থেকেই বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু’কে শ্রদ্ধা
জানানো হল, সম্পূর্ণ অনাড়ম্বরভাবে।”
অপরদিকে, বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু’র জন্মভিটে মোহবনী (যদিও, অনেকে বলেন মেদিনীপুরের হবিবপুর)’তে তাঁর আবক্ষ মূর্তির সামনে শ্রদ্ধা জানানো হয়, কেশপুর যুব কংগ্রেসের
পক্ষ থেকে। উপস্থিত ছিলেন, শেখ নাসির আলী, মোসলেম মল্লিক , আজাহার মল্লিক, আরিফ জামান, জহির আলী, নুরহোসেন খান, শেখ আসানুল্লা, আজাদ আলী প্রমুখরা।







