‘বিশ্ব সর্প দিবস’ উপলক্ষে পরিবেশকর্মী’র বার্তা “সাপ মারবেন না”, সঙ্গে অজস্র তথ্য : দ্বিতীয় পর্ব

বিশেষ প্রতিবেদন, ১৭ জুলাই :
‘ বিশ্ব সর্প দিবস’ (১৬ জুলাই) উপলক্ষে, কলম
ধরলেন অবিভক্ত মেদিনীপুরের অন্যতম পরিবেশকর্মী
তথা বিশিষ্ট বন্যপ্রাণী গবেষক ও বন্যপ্রাণ চিত্রকর
রাকেশ সিংহ দেব।

( আজ দ্বিতীয় পর্ব )

সাপের কামড়ের জন্য অসুস্থতা ও মৃত্যু আমাদের গ্রামগঞ্জের বেশ পরিচিত ঘটনা। ভারতবর্ষে আনুমানিক বছরে দু’ লক্ষ মানুষকে সাপে কামড়ায়, এর মধ্যে পনেরো হাজার মানুষ মারা যায়। National Heath Profile 2019 এর প্রকাশিত তথ্য অনুসারে ২০১৮ সালে পশ্চিমবাংলায় ৩৬২২৯ টি সাপের কামড়ের কেস নথীভুক্ত হয় এবং এদের মধ্যে ২০৩ জন মানুষ মারা যায়। এই পরিসংখ্যান থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে সাপের কামড়ের দ্রুত এবং উপযুক্ত চিকিৎসা হলে মানুষ সহজেই সুস্থ হয়ে যাবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক পর্যবেক্ষণ, ন্যূনতম জ্ঞান আর বিচারশীল মানসিকতার অভাবে সাপ সম্পর্কে অজস্র লোকবিশ্বাস যুক্তির ভিত্তি ছাড়াই আমাদের সমাজে চালু আছে। এই কুসংস্কার আর বুজরুকির ফলেই অধিকাংশ সাপে কাঁটা মানুষ ম,আরা যান।মনে রাখতে হবে, সাপ ভীত, বিরক্ত বা আক্রান্ত না হলে সাধারণত কাউকে আক্রমণ করে না। চোখের সামনে প্রাণীর নাড়াচাড়া দেখলে সাপ সতর্ক হয় এবং আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে কামড়ানোর চেষ্টা করে। আসুন এবার দ্রুত পরিচয় সেরে ফেলা যাক দক্ষিণবঙ্গের বিষধর সাপেদের সাথে।

thebengalpost.in
কালাচ :

একনজরে কালাচ :
সাধারন বাংলা নাম – নিয়রচাঁদা, কালাচ, কালাজ, শিয়রচাঁদা, কালচিতি, শাঁখাচিতি, ডোমনাচিতি, চামরকোষা, ঘামচাটা ইত্যাদি।
ইংরেজি নাম – Common Krait, Indian Krait, Blue Krait
বৈজ্ঞানিক নাম – Bungarus caeruleus (Schneider, 1801)
আয়তন – ৩৯ ইঞ্চি থেকে ৭০ ইঞ্চি ।
সনাক্তকরণ বৈশিষ্ট্য –এদের মাথা আঙুরের মতো লম্বাটে গোলাকার। কালো শরীর। মাথার একটু দূর থেকে লেজের শেষ পর্যন্ত
সাদা গোলাকার দাগ থাকে।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য – নিশাচর। দিনের বেলায় চুপচাপ থাকে। গভীর রাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
বাসস্থান – ইঁদুরের গর্ত, উইয়ের ঢিবি, ধান চালের গুদাম, বাঁশ বাগান, ছায়াঘেরা ঝোপঝাড়, ঘরের ফাটল বা গর্ত।
খাদ্য – ইঁদুর, অন্যান্য সাপ, ব্যাঙ, টিকিটিকি।
প্রজনন – ডিম পাড়ে।
বিষের প্রকৃতি – এদের বিষদাঁত সবচেয়ে ছোট। তীব্র স্নায়ুবিষ বা নিউরোটক্সিন।
বিষের লক্ষণ – কামড়ে কোনও জ্বালা যন্ত্রণা হয়না। স্নায়ুবিষের প্রভাবে গায়ে হাতে ব্যাথা হয়। গাঁটে ব্যাথা। মাথা ঘোরা। বমি ভাব।
তলপেটে ব্যাথা। চোখের পাতা পড়ে আসা বা শিবনেত্র। মুখ সম্পূর্ণভাবে না খুলতে পারা। শ্বাসকষ্ট। রোগীর
ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন পড়ে।
সংরক্ষণ – তফশিল ৪ (Wildlife Protection Act 1972)

[ আরও পড়ুন -   দুপুর থেকেই তুমুল বৃষ্টি কলকাতা সহ একাধিক জেলায়, চলবে আগামীকাল দুপুর পর্যন্ত ]
thebengalpost.in
গোখরো :


একনজরে গোখরো
:
সাধারন বাংলা নাম –খরিশ, দুধা খরিশ, তেঁতুলে খরিশ, তঁপ ইত্যাদি।
ইংরেজি নাম – Indian Cobra, Spectacled Cobra
বৈজ্ঞানিক নাম – Naja naja (Linnaeus, 1758)
আয়তন – ৩৯ ইঞ্চি থেকে ৮৭ ইঞ্চি ।
সনাক্তকরণ বৈশিষ্ট্য – এদের ফনার পেছনের দিকে চশমা বা গরুর খুরের মতো U আকৃতির দাগ থাকে।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য – প্রধানত দিবাচর। তবে এরা দিন রাত উভয় সময়েই সক্রিয় থাকে। স্বভাবত লাজুক পালিয়ে যেতে চায়।
বিরক্ত হলে বা ভয় পেলে ফনা ফুলিয়ে শরীরকে সোজা দাঁড় করিয়ে দিয়ে ফোঁস ফোঁস করে ছোবল মারে।
খুব ভালো সাঁতারু।
বাসস্থান – ইঁদুরের গর্ত, উইয়ের ঢিবি, ধান চালের গুদাম, ঘরের ফাটল বা গর্ত, মাঠ বা জলার ধারে।
খাদ্য – ইঁদুর , অন্যান্য সাপ, ব্যাঙ, পাখি ও তাদের ডিম।
প্রজনন – ডিম পাড়ে।
বিষের প্রকৃতি – তীব্র স্নায়ুবিষ বা নিউরোটক্সিন।
বিষের লক্ষণ – কামড়ে তীব্র জ্বালা যন্ত্রণা হয়। অনেক সময় কামড়ের স্থান ফুলে যায়।
সংরক্ষণ – তফশিল ২ (Wildlife Protection Act 1972)

thebengalpost.in
কেউটে :

একনজরে কেউটে :
সাধারন বাংলা নাম – পদ্ম গোখরো, কালো খরিশ, গেঁড়ি ভাঙা, কেউটে ইত্যাদি।
ইংরেজি নাম – Monocled Cobra
বৈজ্ঞানিক নাম – Naja kaouthia (Lesson, 1831)
আয়তন – ৩৯ ইঞ্চি থেকে ৯১ ইঞ্চি ।
সনাক্তকরণ বৈশিষ্ট্য – এদের ফনার পেছনের দিকে একটি চোখের মতো গোলাকার O আকৃতির দাগ থাকে।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য – প্রধানত নিশাচর। তবে এরা সন্ধ্যা ও ভোরের সময়ে সক্রিয় থাকে। খুব দ্রুত এবং সজাগ সাপ। বিরক্ত হলে বা
ভয় পেলে ফনা ফুলিয়ে শরীরকে সোজা দাঁড় করিয়ে দিয়ে ফোঁস ফোঁস করে বার বার ছোবল মারে। খুব ভালো
সাঁতারু। এরা মাছ খেতে খুব ভালোবাসে তাই অনেকসময় জলা জায়গায় পেতে রাখা মাছ ধরার জালে
বা ঘুনিতে আটকা পড়ে ।
বাসস্থান – জলা জায়গায় থাকতে এরা খুব ভালোবাসে। ইঁদুরের গর্ত, উইয়ের ঢিবি, ধান চালের গুদাম, ঘরের ফাটল বা গর্ত,
মাঠ বা জলার ধারে।
খাদ্য – ইঁদুর , মাছ, অন্যান্য সাপ, ব্যাঙ, পাখি ও তাদের ডিম।
প্রজনন – ডিম পাড়ে।
বিষের প্রকৃতি – তীব্র স্নায়ুবিষ বা নিউরোটক্সিন।
বিষের লক্ষণ – কামড়ে তীব্র জ্বালা যন্ত্রণা হয়। অনেক সময় কামড়ের স্থান ফুলে যায়।
সংরক্ষণ – তফশিল ২ (Wildlife Protection Act 1972)

[ আরও পড়ুন -   ফের নিম্নচাপের ভ্রুকুটি! আগামী ২৪ ঘন্টায় জঙ্গলমহলে এবং আগামী সপ্তাহে মেদিনীপুরে বৃষ্টির সম্ভাবনা ]
thebengalpost.in
চন্দ্রবোড়া :

একনজরে চন্দ্রবোড়া :
সাধারন বাংলা নাম –চন্দ্রবোড়া, দাগি বড়া ইত্যাদি।
ইংরেজি নাম – Russell’s Viper
বৈজ্ঞানিক নাম – Daboia russelii (Shaw & Nodder, 1797)
আয়তন – ৩৯ ইঞ্চি থেকে ৭১ ইঞ্চি ।
সনাক্তকরণ বৈশিষ্ট্য – দেহ মোটা ও ছোটছোট খসখসে আঁশ দিয়ে ঢাকা। মাথা ত্রিকোণাকার। গায়ে বাদামী গোলাকার দাগ থাকে। শরীর মোটা ও লেজ সরু।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য – প্রধানত নিশাচর। বিরক্ত হলে বা ভয় পেলে না ফুলিয়ে শরীরকে গুটিয়ে দিয়ে প্রেসার কুকারের মতো হিস হিস শব্দ করে। চলাফেরা খুব ধীর তবে দ্রুতগতিতে আঘাত হানে। ডাঙার সাপ তবে খুব ভালো সাঁতারু। অধিকাংশ মানুষ রাতে এদের সংস্পর্শে এসে কামড় খায়।
বাসস্থান – খোলা মাঠ, কাঁটা ঝোপঝাড়, পাথরের ফাটল, গর্ত।
খাদ্য – ইঁদুর।
প্রজনন – বাচ্চা দেয়।
বিষের প্রকৃতি – এদের বিষদাঁত সবচেয়ে বড় । তীব্র রক্ত ধ্বংসকারী বিষ বা হেমোটক্সিন।
বিষের লক্ষণ – কামড়ে তীব্র জ্বালা যন্ত্রণা হয়। কামড়ের স্থান তার চারপাশ ফোস্কার মতো ফুলে যায়। নাক, চামড়া, দাঁতের মাড়ি
দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়। অভ্যন্তরীণ রক্তপাত হতে পারে। প্রসাবের সাথে রক্ত আসে। রক্তবমি হয়।
রোগীর ডায়ালেসিসের প্রয়োজন পড়ে।
সংরক্ষণ – তফশিল ২ (Wildlife Protection Act 1972)

[ আরও পড়ুন -   জেলাজুড়ে বাড়ছে কালাচের আনাগোনা, বর্ষার শুরুতেই মেদিনীপুরে উদ্ধার হল বিরল শ্বেত কালাচ ]
thebengalpost.in
শাঁখামুটি :

একনজরে শাঁখামুটি :
সাধারন বাংলা নাম – শাঁখামুটি, শঙ্খিনী, রাজসাপ ইত্যাদি।
ইংরেজি নাম – Banded Krait
বৈজ্ঞানিক নাম – Bungarus fasciatus (Schneider, 1801)
আয়তন – ৫৯ ইঞ্চি থেকে ৮৯ ইঞ্চি ।
সনাক্তকরণ বৈশিষ্ট্য – ফনাহীন সাপ। সারাদেহ মসৃণ আঁশে ঢাকা। দেহ ত্রিভূজাকৃতি। সারাদেহ হলুদ এবং কালোর ডোরাকাটা।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য – নিশাচর। দিনের বেলায় খুব শান্ত প্রকৃতির কিন্তু রাতের বেলায় খুব দ্রুত এবং সজাগ।
কালাচের মতো আঘাত করার প্রবণতা নেই। পশ্চিমবঙ্গে মানুষকে কামড়ানোর ঘটনা এখনও শোনা যায়নি। কালাচের সংখ্যার প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে সবচেয়ে পরিচিত হল শাঁখামুটি। সর্পভুক শাঁখামুটি বা ব্যান্ডেড ক্রেইট এর খাদ্যতালিকার প্রধান উৎস হলো বিভিন্ন সাপ। অত্যন্ত বিষধর কিন্তু স্বভাব লাজুক এই সাপ মানুষের সংস্রব এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করে। শাঁখামুটির প্রিয় খাবার কালাচ ও তার বাচ্চা। স্বাভাবিকভাবেই যেখানে শাঁখামুটির সংখ্যা বাড়বে, সেখানে কালাচের সংখ্যা তত কমবে এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে শাঁখামুটি দেখলেই আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ তাদের মেরে ফেলছে। “কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা”-র যে নিয়ম প্রকৃতি নিজেই করে দিয়েছিল, মানুষ নিজের অপরিণামদর্শিতার ফলে তা নষ্ট করে আজ খেসারত দিচ্ছে। আটকানো যাচ্ছেনা বিষধর কালাচের বাড়বাড়ন্ত। শাঁখামুটির মত বন্ধু সাপ মেরে কালাচের সংখ্যা বাড়িয়ে মানুষ নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে আনছে, আজ সময় এসেছে সেটা বোঝার।

বাসস্থান – ইঁদুরের গর্ত, উইয়ের ঢিবি, বা জলার ধারে খোলা মাঠে।
খাদ্য – ইঁদুর , কালাচ চন্দ্রবোড়ার মত বিষধর এবং অন্যান্য সাপ, সাপের ডিম, ব্যাঙ।
প্রজনন – ডিম পাড়ে।
বিষের প্রকৃতি – তীব্র স্নায়ুবিষ বা নিউরোটক্সিন।
বিষের লক্ষণ – পর্যবেক্ষণ নেই।
সংরক্ষণ – তফশিল ৪ (Wildlife Protection Act 1972) (চলবে)