করোনা মৃত্যুতে সেঞ্চুরি পশ্চিম মেদিনীপুরের, শালবনীতে মৃত্যু হল খড়্গপুরের দুই যুবকের

Century in Corona Death in Paschim Medinipur

thebengalpost.in
শালবনী করোনা হাসপাতালের পরিকাঠামো ও চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে প্রশ্ন :
.

দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১২ সেপ্টেম্বর: সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় (সর্বশেষ?) পূর্ণ লকডাউন শেষ করে, আনলক দশাও যখন ঘুচে যাওয়ার কথা মাথায় আসছে, অর্থাৎ গৃহবন্দী জীবন পরিত্যাগ করে মানুষ যখন কর্মচঞ্চল ও সমাগম পূর্ণ জগতে প্রবেশ করতে চলেছে, সেই সময়ের করোনা পরিসংখ্যান কিন্তু চিন্তা করতে বাধ্য করছে, “এ কোন সকাল রাতের চেয়েও অন্ধকার ?” আনলক দশার শেষ লগ্নে এসে দেশে প্রতিদিন প্রায় ১ লক্ষ মানুষ করোনা সংক্রমিত হচ্ছেন, রাজ্যে সংক্রমিত হচ্ছেন ৩১০০-৩২০০ জন করে, আর জেলায় প্রায় ১৫০-২০০ জন করে। যদিও, পাল্লা দিয়েই বাড়ছে সুস্থতার হারও (দেশে ৭৭ শতাংশ, রাজ্যে ৮৬ শতাংশ এবং জেলাতে খাতায় কলমে ৬২ শতাংশ হলেও, সম্পূর্ণ উপসর্গহীন ধরলে প্রায় ৮০ শতাংশ)! তবে, চিন্তায় রাখছে গোষ্ঠী সংক্রমণ, করোনা-মৃত্যু এবং তার থেকেও বড় কথা উপসর্গযুক্তদের উপযুক্ত চিকিৎসা পরিষেবা’র বিষয়টি। জেলা স্বাস্থ্য দফতরের শুক্রবার রাতের রিপোর্ট অনুযায়ী, পশ্চিম মেদিনীপুরে এই মুহূর্তে করোনা’য় মৃত্যুর হার মাত্র ১.৭৫ শতাংশ (মোট আক্রান্ত ৫৭৩৮ জনের মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু) হলেও, যে বিষয়টি ভাবাচ্ছে তা হল, উত্তরোত্তর মৃত্যু’র সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কো-মর্বিডিটি ও বার্ধক্যজনিত রোগ ছাড়াও মৃত্যু! শুধুমাত্র, করোনা’র উপসর্গ জ্বর, শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হয়ে, প্রায় ২ শতাংশ যেকোনো বয়েসের মানুষ মৃত্যু’র কোলে ঢোলে পড়ছেন!

thebengalpost.in
করোনা মৃত্যুতে সেঞ্চুরি পশ্চিম মেদিনীপুরের :

.

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা স্বাস্থ্য দফতরের শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাতের রিপোর্ট অনুযায়ী, জেলায় করোনা মৃত্যু’র সেঞ্চুরি (১০০) ছুঁয়ে ফেলল। করোনা’র আক্রমণে যে পাঁচটি জেলা (কলকাতা, দুই চব্বিশ পরগনা, হাওড়া, হুগলি) সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, মোট মৃত্যুর নিরীখে সেই পাঁচটি জেলার পরই উঠে এল পশ্চিম মেদিনীপুর! আরো ভয়ঙ্কর তথ্য হল, করোনা’র প্রথম দিন থেকে শুরু করে ৩১ জুলাই পর্যন্ত জেলায় করোনা সংক্রমিত হয়ে মৃত্যু সংখ্যা মাত্র ২৩, ৩১ শে জুলাই থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে মৃত্যু হয় প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক মানুষের (৪৩ জনের)। জেলার তথ্য অনুযায়ী (রাজ্যের করোনা বুলেটিনের সঙ্গে এই তথ্য সম্পর্কিত নয়), ৩১ শে আগস্ট মোট মৃত্যু সংখ্যা বেড়ে হয় ৬৬। আর সেপ্টেম্বর মাসের এই ১১ দিনে মৃত্যু সংখ্যা সেঞ্চুরি করে ফেলল; অর্থাৎ ১১ দিনে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ৩৪ জনের। প্রতিদিন গড়ে ৩ জনের! আর, প্রতিদিনের মৃত্যু’র তালিকা’র দিকে নজর দিলেই এটা পরিস্ফুট যে, বয়স আর কো-মর্বিডিটি কোনো ফ্যাক্টরই হচ্ছে না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। হঠাৎ করেই শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং শ্বাসযন্ত্র বিকল হয়ে মানুষের মৃত্যু ঘটছে এবং অধিকাংশ মৃত্যুই হচ্ছে করোনা হাসপাতালে। আগস্ট মাসে শুধু লেভেল ফোর করোনা হাসপাতালেই মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের (৪৩ জনের মধ্যে)। আরো, মারাত্মক তথ্য হল, সেপ্টেম্বরের প্রথম দশদিনেই লেভেল ফোর করোনা হাসপাতালে মৃত্যু সংখ্যা প্রায় বিশ ছুঁয়েছে (৩৪ জনের মধ্যে)! সেপ্টেম্বর মাসে শুধু মেদিনীপুর শহর ও শহরতলী এবং খড়্গপুর মিলিয়েই সংখ্যাটা ১০ পেরিয়ে গেছে।

thebengalpost.in
খড়্গপুর গত ৭২ ঘন্টায় ৩ জনের মৃত্যু হল করোনা সংক্রমিত হয়ে :

.

বুধবার শালবনীর কোভিড হাসপাতালে মৃত্যু হয় বছর ৩৭ এর এক যুবকের! সুমন দে (রাজা) নামে ওই যুবক ডাইরেক্ট অবজার্ভ ট্রিটমেন্ট (বা DOT) এর আওতায় কাজ করতেন বলে জানা যায় পরিবারসূত্রে। সহৃদয় ও সংবেদনশীল এই যুবক টিবি বা যক্ষ্মা রোগীদের সেবা-শুশ্রুষার কাজ করতেন। শহরের ২ নং ওয়ার্ডের ইন্দা সংলগ্ন বিদ্যাসাগরপল্লী এলাকার বাসিন্দা ছিলেন ওই যুবক। সম্প্রতি, শালবনীর কোভিড হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি এবং বুধবার মারা যান তিনি। রাজার মৃত্যুর ঠিক ২ দিন পরেই (শুক্রবার) খড়্গপুর রেলশহরের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মথুরাকাটির এক যুবকের (৩০) মৃত্যু হল শালবনী করোনা হাসপাতালে। জানা যায়, ওই যুবকের দাদা খড়্গপুর রেল দফতরের কর্মী, তাই, রেল আবাসনেই থাকতেন। পরিবার সূত্রে খবর, ওই যুবক খড়্গপুরের বিগবাজার মাল্টিপ্লেক্সের কর্মী। গত ৩-৪ দিন আগেই ওই যুবকের শরীরে করোনার উপসর্গ (জ্বর) দেখা দিয়েছিল, অ্যন্টিজেন পরীক্ষা করালে তার কোভিড রিপোর্ট পজিটিভ আসে। তারপরেই শালবনীর কোভিড হাসপাতালে তাঁকে চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরিত করা হয়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শালবনীর কোভিড হাসপাতালেই তাঁর মৃত্যু হয়! সূত্রের খবর অনুযায়ী, শুক্রবার অর্থাৎ গতকালও খড়্গপুরেরে এক প্রৌঢ়ের মৃত্যু হয়েছে শালবনী করোনা হাসপাতালে। তিনি, প্রয়াত বিধায়ক জ্ঞান সিং সোহনপালের আত্মীয় বলে জানা গেছে। শুধুমাত্র গত ৭২ ঘন্টায় শালবনী করোনা হাসপাতালে প্রায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে বিশ্বস্ত সূত্রে।

thebengalpost.in
শালবনী করোনা হাসপাতালের পরিকাঠামো ও চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে প্রশ্ন :

অপরদিকে, বেশ কিছুদিন ধরেই, জেলার একমাত্র লেভেল ফোর করোনা হাসপাতাল শালবনী’র পরিকাঠামো ও চিকিৎসা পরিষেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। সম্প্রতি, জেলার করোনা টাস্ক ফোর্সের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে, শালবনী করোনা হাসপাতাল নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন রাজ্যের স্বাস্থ্য কর্তারা। এরপরই সরিয়ে দেওয়া হয়, প্রথম থেকে শালবনী করোনা হাসপাতালের সুপারের দায়িত্বে থাকা অভিষেক মিদ্যাকে। হাসপাতালের নতুন সুপার করা হয় ডেপুটি সুপারের দায়িত্বে থাকা নবকুমার দাস’কে। জেলা স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১০০ জনের। তার মধ্যে শালবনী কোভিড হাসপাতালেই মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৪০ জনের! গতকাল (১১ সেপ্টেম্বর), মেদিনীপুরের এক সমাজকর্মী অভিযোগ জানিয়েছেন যে, “বৃহস্পতিবার থেকে শালবনীর কোভিড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক করোনা আক্রান্ত রোগী বাড়িতে ফোন করে বলেন সেখানে প্রতিনিয়ত পরিকাঠামোগত সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাঁকে। শালবনীর করোনা হাসপাতালে দ্বিতলে থাকা ওই রোগী বলেন তাঁর শয্যার কাছাকাছি কোনো ফ্যানের ব্যবস্থা নেই, নেই কোনো জানালাও! কোভিড আক্রান্ত ওই রোগীর চিকিৎসার জন্য অক্সিজেনের প্রয়োজন, আর অক্সিজেন দেওয়া হলে ফ্যান বা হাওয়া-বাতাসের খুব প্রয়োজন, তাই ওই রোগী খুব কষ্টের মধ্যেই বাড়িতে ফোন করে বিষয়টি জানান। এরপর, বাড়ির তরফ থেকে টেবিল ফ্যানের ব্যবস্থা করা হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করেনি। পরে শুনলাম ওই রোগীকে অন্য শয্যাতে দেওয়া হয়েছে।” তবে, হাসপাতালের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং চিকিৎসা পরিষেবার মানোন্নয়ন বিষয়ে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ নিমাই চন্দ্র মন্ডল সম্প্রতি জানিয়েছেন, “পরিকাঠামোগত ত্রুটি বিশেষ নেই, তা সত্বেও আরো গুরুত্ব দিয়ে বিষয়গুলি দেখা হচ্ছে।”
*আরো পড়ুন: ফের এক হস্তি শাবকের মর্মান্তিক মৃত্যু পশ্চিম মেদিনীপুরে….

.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে