গুলি, বোমা, হিংসা, নৃশংসতা, মৃত্যু নিয়ে কেশপুর আজও রাজনীতির ‘শেষপুর’, নিরীহ কিশোর সহ ২ মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার ১২

thebengalpost.in
স্বর্ণালংকার ব্যবসায়ী মদনমোহন মন্ডল‌:
.

দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, কেশপুর (পশ্চিম মেদিনীপুর), ১৯ সেপ্টেম্বর : শত মহামারী, বন্যা, খরা, রাজনৈতিক উত্থান-পতন যাই ঘটুক না কেন, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ‘কেশপুর’ আছে কেশপুরেই! গুলি, বোমা, হিংসা, নৃশংসতা, মৃত্যু নিয়ে সে যেন আজও “শেষপুর”; মুহূর্তের মধ্যে সুস্থ জীবন যেখানে চিরতরে শেষ! ১ লা সেপ্টেম্বর গুলি-গোলা চলার পর, ফের ১৫ দিন যেতে না যেতেই ভয়ঙ্কর বোমাবাজিতে প্রাণ গেল, নিরীহ এক কিশোর (১৪) সহ ২ জনের। গুরুতর আশঙ্কাজনক অবস্থায় এক মহিলা’কে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ থেকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে কলকাতায়! পুলিশ, বোমাবাজি ও হত্যালীলার ঘটনায় এখনো পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে। বাকিদের খোঁজেও তল্লাশি চলছে বলে জানা গেছে।

thebengalpost.in
কেশপুরের বোমাবাজি’তে বৃহস্পতিবার মৃত মহম্মদ নাসিম (৪২) :

.

পশ্চিম মেদিনীপুরে কেশপুর থানার দামোদরচকে বৃহস্পতিবার রাতে শাসক দলের (পড়ুন, তৃণমূলের) দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে ২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা নাগাদ কেশপুর থানা থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে অবস্থিত, দামোদরচক গ্রামে, তৃণমূল কংগ্রেসের দুই গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে প্রথমে বচসা বাধে, পরে দুই গোষ্ঠী পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং এলোপাথাড়ি বোমাবাজি শুরু করে। দামোদরচকের আশেপাশের এলাকা থেকেও বোমার আওয়াজ পাওয়া যায়, জানা গেছে এমনটাই। এই সংঘর্ষের মাঝে পড়ে, শেখ মাজাহার নামে সপ্তম শ্রেণীর এক ছাত্রের (১৪) প্রাণ যায় ঘটনাস্থলেই! এছাড়াও, শেখ মহম্মদ নাসিম (৪২) নামে আরেক ব্যক্তির মৃত্যু হয় হাসপাতালে নিয়ে আসার পথেই, সেও সক্রিয়ভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলনা, তবে তৃণমূল সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিল বলে জানা গেছে। অপরদিকে, বোমাবাজিতে গুরুতর জখম এক মহিলা’কে প্রথমে কেশপুর হাসপাতাল, পরে মেদিনীপুর মেডিক্যাল এবং শুক্রবার দুপুরে কলকাতায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও, আরো ২ জন আহত ব্যক্তির চিকিৎসা চলছে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে, এমনটাই জানা গেছে। দামোদরচকের বাসিন্দা এবং নিহত-আহতদের পরিবারের তরফে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করে একটি ঘটনায়, দুই গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে বচসা বাধে। এরপরই, হঠাৎ করে বোমা ছুঁড়তে শুরু একটি গোষ্ঠী। তাদের ছোঁড়া বোমায় গুরুতর জখম হন, নাসিম নামের ওই ব্যক্তি, সেইসময় যিনি নামাজ পড়ে ফিরছিলেন বলে জানা গেছে। অপরদিকে, মাজাহার নামে সেই স্কুল পড়ুয়া সামনেই তার মামারবাড়ি থেকে ফিরছিল। হঠাৎ বোমা বাজিতে তার পিঠের একটা অংশ উড়ে যায়! ঘটনাস্থলেই ঐ কিশোরের মৃত্যু হয়। অপরদিকে, নিজের বাড়ির উঠোনে রান্না করছিলেন, এক মহিলা, দুষ্কৃতীদের ছোঁড়া বোমার আঘাতে তিনিও গুরুতর আহত হন। তাঁকে কেশপুর হাসপাতাল থেকে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ ও পরে কলকাতায় এক সরকারি হাসপাতালে শুক্রবার স্থানান্তরিত করা হয় বলে জানা গেছে।

thebengalpost.in
কেশপুরে বোমাবাজি কান্ডে মৃত কিশোর শেখ মাজাহার (১৪) :

.

শুক্রবার, দামোদরচকে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে যেন শ্মশানের শান্তি! এলাকায় চলছে পুলিশি টহল এবং রয়েছেন কেশপুর থানার পুলিশ আধিকারিকরা। দোষীদের শাস্তির দাবিতে সারা গ্রাম মুখর! স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই বোমাবাজি কান্ডে এক্তার নামে এক যুবক মূল অপরাধী। আগে, সিপিআইএম করলেও, এই মুহূর্তে তিনি তৃণমূলের একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। অপরদিকে, আহত ও নিহতরা তৃণমূলের অন্য একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। কেশপুর এলাকায় সর্বজনবিদিত যে, এখানে বিবাদমান দুই গোষ্ঠী হল, উত্তম ত্রিপাঠীর গোষ্ঠী ও সঞ্জয় পানের গোষ্ঠী। সম্প্রতি, ১৫ সেপ্টেম্বর তৃণমূলের ব্লক সভাপতি হিসেবে উত্তম ত্রিপাঠীর নাম ঘোষিত হয়েছে। এরপরই ক্ষেপে যায় সঞ্জয় পানের গোষ্ঠী, এমনটাই জানা গেছে স্থানীয় সূত্রে। এই, সংঘর্ষ ও বোমাবাজি কাণ্ডের সঙ্গে তাই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সম্পর্কটি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না! যদিও, আরেকটি সূত্রের মতে, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে, খুব পুরানো একটি পারিবারিক সমস্যাও যুক্ত। একটি জমির মালিকানা’কে কেন্দ্র করে প্রায় লাখখানেক টাকা লেনদেনের বিষয় জড়িত বলে জানা গেছে। আর, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গোষ্ঠী বিবাদ! দুইয়ে মিলে, রাজনৈতিক জগতের ‘আতঙ্কপুরী’ হিসেবে কুখ্যাত কেশপুরে একটি ছোট্ট ঘটনা থেকে হঠাৎ করেই গুলি ও বোমাবাজি শুরু হয়। প্রাণ যায়, নিরীহ এক কিশোর এবং এক ব্যক্তির। এদিকে, ওই ব্যক্তির ভাই তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য বলে জানা যায়। মৃত নাসিমের ভাই তথা তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য সেলিম বলেন, এক্তার নামে ওই প্রাক্তন হার্মাদের নেতৃত্বে এই তাণ্ডবলীলা চলেছে। তবে, অন্য এক ভাই জানিয়েছে, এই এলাকায় গোষ্ঠী কোন্দল আছে, তৃণমূলের সব নেতাই জানে, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেয়নি! অপরদিকে, তৃণমূলের জেলা সভাপতি অজিত মাইতি জানিয়েছেন, একটি পারিবারিক বিবাদকে কেন্দ্র করে, সিপিআইএমের প্রাক্তন হার্মাদরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। নিহতরা আমাদের দলের কর্মী ও সমর্থক। অবিলম্বে দোষীদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। অপরদিকে, বিজেপি’র জেলা সহ-সভাপতি শিবু পানিগ্রাহী জানিয়েছেন, “কেশপুর আছে গেছে কেশপুরেই। শাসক দল যার কেশপুর তার। স্বভাবতই তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফলে এই ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে পুলিশের সদর্থক ভূমিকা দেখতে চাই আমরা।” অন্যদিকে, সাধারণ কেশপুর বাসীর প্রশ্ন, কেশপুরে গুলি-বোমার সেই চিরাচরিত ইতিহাসের অবসান কি হবেনা !

thebengalpost.in
শুক্রবার কেশপুর গ্রামে চলছে পুলিশি টহল :

.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে