দু’দিনের মধ্যে জঙ্গলমহলে ফের হাতির মৃত্যু, ১০০ দিনের মধ্যে একই এলাকায় একইভাবে হাতির মৃত্যু’তে নীরব সব পক্ষই

again an accidental death of an elephant in Paschim Medinipur

.

মণিরাজ ঘোষ, শালবনী, ১৪ সেপ্টেম্বর : গত ১২ ই সেপ্টেম্বর (শনিবার), পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গোয়ালতোড়ের চাউলিতে তমাল নদী পেরোতে গিয়ে, এক হস্তি শাবকের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু ঘটেছিল! মাত্র ২ দিনের (বা, ৪৮ ঘন্টার) ব্যবধানে, ফের সেই জঙ্গলমহলে, এক পূর্ণ বয়স্ক হাতির মৃত্যু ঘটল। এবার, ঘটনাস্থলের নাম শালবনী ব্লকের ভীমপুর ৬ নং অঞ্চলের বাঁদি গ্রাম। মেদিনীপুর বনবিভাগের লালগড় রেঞ্জের অন্তর্গত জঙ্গললাগোয়া এলাকায় গতকাল (রবিবার) রাতেই হাতিটির মৃত্যু হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে। আজ সকালে, বনদপ্তরের আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পৌঁছন। এলাকায় জনসমাগম হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, হাতিটির পোস্টমর্টেমের জন্য নমুনা সংগ্রহ করতে মেদিনীপুর পশু হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিজেদের কাজ শুরু করেছেন। তবে, পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট পাওয়া যাবে অন্তত দু-তিন দিন পর, এমনটাই জানা গেছে বনদপ্তর সূত্রে। তার আগে, কোন পক্ষই হাতিটির মৃত্যু’র কারণ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয়! প্রায় ১০০ দিন (প্রায় সাড়ে তিন মাস) আগে ৩১ শে মে, শালবনী ব্লকের লালগড় রেঞ্জেরই কদমাশোল গ্রামে হাতি মৃত্যুর ঘটনা’র ছায়াই যেন এক্ষেত্রেও পাওয়া যাচ্ছে।

thebengalpost.in
জঙ্গলমহলে ফের পূর্ণ বয়স্ক হাতির মৃত্যু :

.
.

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শালবনী ব্লকের জঙ্গলঘেরা বান্দি গ্রামে হাতিটির মৃত্যু হয়, গতকাল রাতে। সকালে দেখা যায়, ধান জমি ও জঙ্গলের মাঝখানে পড়ে আছে পূর্ণ বয়স্ক হাতিটির মৃতদেহ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেল, পূর্ণবয়স্ক হাতিটির মৃত্যু হয়েছে গতকাল রাতেই। এরপরই, ঘটনাস্থলে পৌঁছন মেদিনীপুর বনবিভাগের এডিএফও বিজয় চক্রবর্তী, লালগড়ের রেঞ্জ অফিসার শ্রাবনী দে সহ বনদপ্তরের কর্মী ও আধিকারিকেরা। উপস্থিত হয়েছিলেন, পিড়াকাটা পুলিশ পোস্টের পুলিশকর্মীরাও। হাতি মৃত্যুর এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে, আশেপাশের গ্রাম থেকেও প্রচুর লোক জড়ো হয়। পৌঁছে যান বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কর্মীরাও। কিন্তু, হাতি মৃত্যুর সঠিক কারণ গোপনই থেকে যায়, রহস্যজনকভাবে। ঠিক সাড়ে তিন মাস আগে, এক পূর্ণগর্ভা হস্তিনীর মৃত্যু ঘটেছিল, লালগড় রেঞ্জের কদমাশোল গ্রামে (ভীমপুর ও পিড়াকাটার মাঝামাঝি এলাকা)। সেবার, হস্তিনীর পেট থেকে বেরিয়ে এসেছিল, প্রায় পরিণত এক মৃত হস্তি শাবক! মা’এর মৃত্যুর সাথে সাথে, সেই শাবকের মৃত্যুও হয়েছিল, মায়ের গর্ভে! দুঃখজনক সেই ঘটনারও কোনো তদন্ত হয়েছে বলে জানা যায়নি, অথচ হয়েছিল ময়নাতদন্ত। পশুপ্রেমীরা পরোক্ষে অভিযোগ জানিয়েছিলেন, ক্ষেতের ফসল নষ্ট করার জন্য গ্রামবাসীরা ইলেকট্রিক শক দিয়ে হাতিটিকে মেরে ফেলেছে! এবারও সেই একই অভিযোগ উঠছে এবং একইরকম ভাবে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ারও চেষ্টা চলছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে এবং সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরায় উঠে এসেছে, ধান জমিতে হাতির দাপাদাপি’র ছবি। গ্রাবাসীরা স্পষ্ট বললেন, ১০-১৫ টি হাতির দল এই এলাকায় অবস্থান করছিল কয়েকদিন ধরেই। অভিযোগ উঠছিল, ফসল নষ্ট করার। তবে কি ফসল রক্ষা করতেই জমিতে কোনোভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছিল! যদিও, কাছাকাছি কোথাও বিদ্যুতের তার পাওয়া যায়নি, তবে হাতি মৃত্যুর অন্য কোনো কারণও জানাতে পারেনি বনদপ্তর। এডিএফও বিজয় বাবু জানিয়েছেন, “ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ছাড়া বলা সম্ভব নয়।” আসলে, ঘটনার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না, বনদপ্তর কিংবা প্রশাসন। যেভাবে, গ্রামের পর গ্রামে হাতিদের দাপাদাপি কিংবা বিঘার পর বিঘা ফসল নষ্ট করছে হাতিরা, তার সুরাহা করতে পারেনি বনদপ্তর বা প্রশাসন। শুধুমাত্র, উত্তপ্ত শলাকা বা হুলা দিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে বা এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে হাতি তাড়িয়ে যে সুষ্ঠু সমাধান করা সম্ভব নয়, তা সংশ্লিষ্ট সকলেই জানেন। অথচ সকলেরই এক প্রশ্ন, “তবে উপায় কি?”

thebengalpost.in
জঙ্গলমহলে ফের পূর্ণ বয়স্ক হাতির মৃত্যু :

.

আসলে, হাতি’র উপর অত্যাচার ও মৃত্যু এবং গ্রামবাসীদের ঘর-বাড়ি ও ফসলের ক্ষতি থেকে হাতির হামলায় মৃত্যু, এই দুইয়ের মাঝে পড়ে বনদপ্তরের অবস্থানও ঠিক “ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি”র মতো! শুধুমাত্র, ক্ষতিপূরণ দিয়েই দায় সারতে হয় বনদপ্তরকে। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মেদিনীপুর বনবিভাগ এবং ঝাড়গ্রাম জেলার অন্তর্গত বিভিন্ন রেঞ্জ মিলিয়ে প্রায় কয়েশো হাতি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বেশ কয়েকমাস ধরেই। জঙ্গলমহলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই হাতি ঠাকুরের আক্রমণে, ফসল ও ঘর-বাড়ি নষ্ট হওয়া ছাড়াও, গত এক বছরে প্রাণ গেছে অন্তত ১০ জনের! সম্প্রতি, মে মাসেই মেদিনীপুর বনবিভাগের পিড়াকাটা রেঞ্জে ঘটে গেছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। জঙ্গল লাগোয়া পুকুর পাড়ে, এক কিশোরকে একা পেয়ে আছড়ে মেরে ফেলেছিল, হাতির দল। তার কয়েকদিনের মধ্যে, মাত্র ৩ কিলোমিটারের মধ্যে কদমাশোলে ঘটেছিল হাতি মৃত্যুর ঘটনা! এবার সেই কদমাশোল থেকে মাত্র ৮-১০ কিলোমিটারের মধ্যে ফের একইভাবে হাতি মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো। পশুপ্রেমী তথা বন্যপ্রাণ গবেষক রাকেশ সিংহ দেব বললেন, “পরিবেশবান্ধব হাতি’র মৃত্যু নিঃসন্দেহে দুঃখজনক ঘটনা! তবে, হাতিদের উপযুক্ত বাসস্থানের ফিরিয়ে দেওয়া কিংবা তাদের খাবারের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে না পারলে, এভাবেই হাতি ও মানুষের মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক থেকেই যাবে।”
(ছবিগুলি তুলেছেন : রাকেশ সিংহ দেব।)
***আরো পড়ুন: বেদনাদায়ক মৃত্যু! নিহত হস্তিনীর গর্ভ থেকে বেরিয়ে এল মৃত হস্তি শাবক…..

.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে