“ব্ল্যাক ফাঙ্গাস” কি? কিভাবে ছড়ায়? পশ্চিম মেদিনীপুর বাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ স্বাস্থ্য দপ্তরের

thebengalpost.in
দৈনিক মৃত্যু কমছেনা কিছুতেই :

দ্য বেঙ্গল পোস্ট বিশেষ প্রতিবেদন, মণিরাজ ঘোষ, ২১ মে : কোভিড ১৯ (Covid 19) বা করোনা ভাইরাসের পর নতুন আতঙ্কের নাম “ব্ল্যাক ফাঙ্গাস” বা মিউকরমাইকোসিস (Mucormycosis)। ইতিমধ্যে, রাজস্থান (১০০ জনের মৃত্যু) ও তেলেঙ্গানা সরকার একে মহামারী ঘোষণা করেছে। মহারাষ্ট্রও বিশেষ রোগ হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করেছে। মহারাষ্ট্রে ইতিমধ্যেই দেড় হাজারের বেশি ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের রোগী চিহ্নিত হয়েছেন। ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে এই রোগে। অপরদিকে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গেও ব্ল্যাক ফাঙ্গাস থাবা বসিয়েছে! সূত্র অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত রাজ্যে ৫ জনের শরীরে মিলেছে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের উপসর্গ। কেন্দ্র সরকার প্রতিটি রাজ্যকেই পরামর্শ দিয়েছে, “ব্ল্যাক ফাঙ্গাস” কেও মহামারী (Epidemic) হিসেবে চিহ্নিত করতে বা মহামারী আইনে এই রোগকে নথিভুক্ত করতে। ফলে, এই ধরনের রোগী এলে এবার থেকে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দিয়ে, রোগীর সম্পূর্ণ বিবরণ নথিভুক্ত করে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রককে পাঠাতে হবে।

thebengalpost.in
ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা মিউকরমাইকোসিস (Black Fungus/ Mucormycosis) :

মোবাইলে খবর পেতে জয়েন করুন
Whatsapp Group এ

অতিমারি আবহে, মূলত কোভিড আক্রান্তদের শরীরে দেখা দিচ্ছে বিরল এই ‘ব্ল্যাক ফাঙ্গাস’ (বা মিউকরমাইকোসিস) নামক ছত্রাকের সংক্রমণ। যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় বলা হচ্ছে- মিউকরমাইকোসিস (Mucormycosis)। কিন্তু, কি এই ‘ব্ল্যাক ফাঙ্গাস’ বা মিউকরমাইকোসিস? কিভাবেই তা ছড়িয়ে পড়ে? জঙ্গলমহল পশ্চিম মেদিনীপুরে কি অবস্থা? এসব নিয়েই আমরা কথা বলছিলাম জেলার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য আধিকারিক’দের সাথে। মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের প্রফেসর তথা জেলার প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং আইএমএ (IMA)’র জেলা সম্পাদক ডাঃ কৃপাসিন্ধু গাঁতাইত জানালেন, “মিউকরমাইকোসিস হল পরিবেশের মধ্যে বাতাসে থাকা একধরনের ছত্রাক বা অনুজীব বা জীবাণু। মূলত দুর্বল শরীরেই বাসা বাঁধে এই ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা মিউকরমাইকোসিস ছত্রাক। যেহেতু, করোনা রোগীর (Coronavirus Patients) শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তাই অনেক সময় এই ধরনের রোগীর শরীরে এই ফাঙ্গাল সংক্রমণ হতে পারে বলে সাবধান করে দেওয়া হচ্ছে। যদিও, এই রাজ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র ৫ টি ধরা পড়েছে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, যে সমস্ত ডায়াবেটিক বা সুগারের রোগী, ক্যান্সারের রোগীরা করোনা সংক্রমিত হয়ে দীর্ঘদিন আইসিসিইউ (ICCU) তে চিকিৎসাধীন থাকছেন, তাদের ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র ভয়ের কারণ থাকতে পারে।” ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চের (ICMR) জারি করা একটি বিবৃতিতেও বলা হয়েছে, যেসব কোভিড রোগীরা ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাঁদের মধ্যে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। ক্যান্সার সহ অন্যান্য জটিল রোগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এছাড়াও করোনা আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ দিন আইসিইউতে থাকা, স্টেরয়েড ব্যবহার, কোমর্বিডিটি-পোস্ট ট্রান্সপ্যান্টে আক্রান্তদের সাবধানে থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। করোনা আক্রান্তদের শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়ায় এ জাতীয় রোগের প্রকোপ বাড়ছে বলেও বলা হয়েছে। মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের পালমোনারি মেডিসিন বা ফুসফুস সম্বন্ধীয় চিকিৎসক ডাঃ প্রবোধ পঞ্চ‌্যধ্যয়ী করোনা কালে প্রতিদিন শতাধিক করোনা আক্রান্ত রোগী দেখছেন। তিনি জানালেন, “এখনও পর্যন্ত আমরা একজনও এরকম রোগী পাইনি।” কিভাবে এই রোগ ছড়ায় এবং কোথায় আক্রমণ করে? তিনি জানালেন, “নাক, সাইনাস, চোখ, মস্তিষ্ক আর ফুসফুসে মূলত ছড়ায় সংক্রমণ। তবে, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে সাইনাসের দেওয়ালকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে; আর ব্রেন বা মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়লে তা বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে। তবে, তার আগেই ধরা পড়লে চিকিৎসা বা সার্জারি হতে পারে। এক্ষেত্রে, ইএনটি (ENT) স্পেশালিস্টদের সাহায্য নিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে অক্সিজেন নিয়ে আইসিইউ তে চিকিৎসাধীন থাকলে, স্টেরয়েড ব্যবহার করলে এবং রোগীর ইমিউনিটি বা প্রতিরোধ ক্ষমতা একদম শেষ হয়ে গেলে এই ছত্রাক আক্রমণ করতে পারে।” আগেও কি এই ছত্রাকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে? ডাঃ গাঁতাইত এবং ডাঃ পঞ্চধ্যয়ী দু’জনই বললেন, “আগেও ছিল। তবে, অত্যন্ত বিরল বা অতিবিরল। করোনা পরিস্থিতিতে এর নতুন করে প্রাদুর্ভাব হয়েছে। যেহেতু, এই রোগের চিকিৎসায় স্টেরয়েড ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সংকটজনক রোগীদের দীর্ঘদিন অক্সিজেন নিতে হচ্ছে।” তবে, বারবার তাঁরা উল্লেখ করেছেন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একদমই যাঁদের কমে যায় এবং আইসিইউ’তে দীর্ঘদিন থাকতে হচ্ছে, তাঁদের ক্ষেত্রেই ভয়ের কারণ থাকতে পারে। তবে, ধরা পড়ার পর দ্রুত চিকিৎসা শুরু হলে বা সার্জারি হলে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগী সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন বলেও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

thebengalpost.in
ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা কৃষ্ণ ছত্রাক :

মিউকরমাইকোসিস বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের উপসর্গ কি কি? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন— নাকের উপরে কালো ছোপ, দেখতে অসুবিধা হওয়া বা ব্লাইন্ডনেস, নাক বন্ধ, নাক থেকে পুঁজ বের হওয়া, সর্দি সবই এই রোগের লক্ষণ। সঙ্গে নাক দিয়ে কালচে কফ বেরোতে পারে। নাকের ভিতরের অংশ কালচে রঙের হয়ে যেতে পারে। মুখের ভেতরে, বিশেষত চোয়াল ও গালে ব্যথা; চোয়াল আলগা হয়ে যাওয়া; গলায় অতিরিক্ত ব্যথা অনুভব- এই রোগের লক্ষণ। সংক্রমণ বেশি ছড়ালে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্টও দেখা দিতে পারে। নাক, সাইনাস, চোখ, মস্তিষ্ক, ফুসফুস ছাড়াও কিছু ক্ষেত্রে খাদ্যনালী, চামড়া এবং অন্যান্য অঙ্গেও এর প্রভাব পড়তে দেখা গিয়েছে। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর বা করোনা মুক্ত হওয়ার পর বাড়ি ফিরে ব্ল্যাক আউট বা চারপাশ অন্ধকার হয়ে যাওয়া, চোখে কম দেখা থেকে ব্লাইন্ডনেস এই রোগের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হতে পারে। তবে, এই ধরনের রোগীর সংখ্যা এখনও পর্যন্ত আমাদের রাজ্যে মাত্র ৫ টি এবং জেলায় “শূণ্য”। সম্প্রতি, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, আইসিসিইউ (ICCU) বা এইচডিইউ (HDU) তে থাকা রোগীদের এই রোগ বেশি হওয়ার অন্যতম একটি কারণ- অপরিচ্ছন্ন হিউমিডিফায়ার। কি এই হিউমিডিফায়ার? অক্সিজেন সিলিন্ডারের সঙ্গে একটি পাত্রে ডিস্টিলড ওয়াটার (যদিও বেশিরভাগ সময় ডিস্টিলড ওয়াটার দেওয়া হয়না, সাধারণ জলই দেওয়া হয়) থাকে। যার মধ্য দিয়ে অক্সিজেন যায়। এটিকেই হিউমিডিফায়ার বলা হয়। চিকিৎসকদের মতে, হিউমিডিফায়ার নিয়মিত পরিষ্কার না করা হলে সেখানে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের জীবাণু জন্ম নেয়। তারপর তা রোগীর শরীরে ঢুকে মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে। অক্সিজেন হিউমিডিফায়ার নিয়মিত পরিষ্কার না করলে ছড়াতে পারে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বললেন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার উপ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ সৌম্যশঙ্কর সারেঙ্গীও। তিনি বললেন, “আমাদের জেলার হাসপাতালগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ডিস্টিলড ওয়াটার ব্যবহার করতে এবং নিয়মিত পরিষ্কার করতে।” ডাঃ কৃপাসিন্ধু গাঁতাইত আবার যোগ করলেন, “অস্বাস্থ্যকর অক্সিজেন মাস্ক বা অপরিষ্কার অক্সিজেন মাস্কের মধ্যেও এই ছত্রাক জন্ম নিতে পারে। তাই এই বিষয়েও সচেতন থাকা দরকার।” তবে, জেলায় এই রোগের বিষয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ নিমাই চন্দ্র মন্ডল এবং উপ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ সৌম্যশঙ্কর সারেঙ্গী।

thebengalpost.in
অক্সিজেন হিউমিডিফায়ার নিয়মিত পরিষ্কার বা স্যানিটাইজেশন করার পরামর্শ :

অন্যদিকে, ভারতে “সাদা ছত্রাক” (White Fungus) সংক্রমণ নিয়েও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। বলা হচ্ছে এটি কৃষ্ণ ছত্রাক বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের থেকেও ভয়ঙ্কর। যদিও, এখনও পর্যন্ত ভারতে সাদা ছত্রাক সংক্রমণের ঘটনা দেখা গিয়েছে শুধুমাত্র বিহারে। বৃহস্পতিবার পাটনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চারটি সাদা ছত্রাক সংক্রমণের ঘটনা সনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. এস.এন সিং। এই সাদা ছত্রাক নাকি কৃষ্ণ ছত্রাকের থেকেও সংক্রামক! তবে, সব ধরনের সাদা ছত্রাক যে বিপজ্জনক নয় তা জানিয়েছেন আইএমএ’র জেলা সম্পাদক ডাঃ কৃপাসিন্ধু গাঁতাইত। “সাদা ছত্রাক” নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে তাঁর অভিমত।

আরও পড়ুন -   একটানা নিম্নচাপের ফলে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে বৃষ্টি, জানালো হাওয়া অফিস