ছেলের ‘জেদ’ পূরণ করতে যাওয়াই কাল হল! লক্ষ্মীর ‘প্রদীপ’ সত্যিই নিভে গেল

মণিরাজ ঘোষ, শালবনী,  ২৭  মে   :    ছেলে জেদ ধরেছিল মহার্ঘ্য মোবাইল (কেতাদুরস্ত স্মার্টফোন)’ই তার চাই! বেঁকে বসেছিলেন বাবা। বাবার দুর্বলতায় আঘাত দিয়ে অষ্টাদশ বর্ষীয় ছেলে বলেছিল, “একটাই তো প্রদীপ! নিভে গেলে বুঝবে।” সে যাত্রায় একমাত্র ছেলের ‘জেদ’ পূরণ করা সত্ত্বেও, তার জীবন-প্রদীপ যে মাসখানেকের মধ্যেই নিভে যাবে, বোধহয় কল্পনাও করতে পারেননি, আপাত সহজ-সরল লক্ষ্মীকান্ত মান্না। গতকাল সন্ধ্যায় দলমার দামালদের অতর্কিত হানায়, প্রাণ গেলো একমাত্র পুত্র রথীনের!

 

মাত্র কয়েকমাস (৬-৭ মাস) আগেই, বাবা’র কাছে জেদ ধরে স্মার্টফোন কিনেছিল, শালবনী ব্লকের পিড়াকাটা উচ্চ বিদ্যালয় (উ:মা) এর দ্বাদশ (সদ্য একাদশ শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছিল) শ্রেণীর ছাত্র রথীন মান্না (১৭ বছর ১১ মাস)। বাড়ি পিড়াকাটা বাজার থেকে তিন কিলোমিটার দূরে আমজোড় শালবনী গ্রামে (৭ নং গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত)। বাবা লক্ষ্মীকান্ত মান্না (৪২)’র একটি পা জন্ম থেকেই অকেজো! তা নিয়েই পিড়াকাটা বাজারে, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে সেলুন চালিয়ে সংসার চালিয়ে গেছেন এবং একমাত্র ছেলেকে মাধ্যমিক পাস করিয়ে উচ্চ-শিক্ষিত করার ‘স্বপ্ন’ দেখেছেন! সেই স্বপ্নই এক নিমেষে ভেঙে-চুরে একাকার হয়ে গেছে, একমাত্র ছেলের ‘সখ’ পূরণ করতে গিয়ে! গতকাল, সন্ধ্যা ৬-৬.৩০ টা নাগাদ, গ্রামের কয়েকজন যুবক মিলে রাস্তার ধারে একটি (একটি পুকুর পাড়ে) কালভার্টে বসে মোবাইলে গেম খেলছিল ও গান শুনছিল। বাকিরা চলে গেলেও রথীন কিছুক্ষণ বসেছিল (যদিও পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, সে পুকুরের পাশে মাঠে মলত্যাগ করতে গিয়েছিল)। কানে হেডফোন থাকায় এবং মোবাইলে মন থাকায় সে বুঝতে পারেনি, কাছের জঙ্গল থেকে প্রায় চার-চারটি বুনো হাতির আগমন! যখন বুঝতে পারে তখন সব শেষ! একটি হাতি শুঁড়ে করে পেঁচিয়ে, পুকুর পাড়ে ফেলে দেয় রথীন’কে। ছুটে পালাতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় সে! সেখানেই পড়ে থাকে মোবাইল ও হেডফোন। গ্রামবাসীরা রথীনকে তুলে নিয়ে আসার পর বনদপ্তরে খবর দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসে পিড়াকাটা রেঞ্জের অধীন বনকর্মীরা। সকলে মিলে, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা-আটটা নাগাদ রথীন’কে নিয়ে যান, মেদিনীপুর সদর হাসপাতালে। সেখানেই চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করে! বনকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাস্তাতেই মৃত্যু হয়েছিল রথীনের। আজ, ময়নাতদন্তের পর দেহ পাবে পরিবার-পরিজনেরা। কিন্তু তার আগেই, জঙ্গলমহলের এই প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, যেন শ্মশানের শান্তি! লক্ষ্মীর একমাত্র জীবন-প্রদীপ নিভে যাওয়ায় সারা গ্রাম জুড়ে অন্ধকার নেমে এসেছে। রথীনের এক কাকু বললেন, “সন্ধ্যার দিকে মোবাইল নিয়ে রথীন মলত্যাগ করতে গিয়েছিল পুকুরের ধারে, মাঠে। সেখানেই হাতির আক্রমণে তার মৃত্যু হয়।”

[ আরও পড়ুন -   এবার করোনায় আক্রান্ত হলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ]

যদিও এই বক্তব্যের সঙ্গে সহমত নন, বনকর্মী থেকে শুরু করে পিড়াকাটার রেঞ্জ অফিসার পাপন মোহান্ত। পাপন বাবু বললেন, “সন্ধ্যা সাতটা-সাড়ে সাতটা নাগাদ আমরা খবর পেয়ে সেই গ্রামে ছুটে যাই। আমাদের বনকর্মীরা ও গ্রামবাসী কয়েকজন মিলে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় রথীন’কে। তবে, চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আমরা তদন্ত করে যেটুকু বুঝতে পেরেছি, চারটি হাতি একসাথে বেরিয়েছিল। প্রথমে একটি ছোট হাতি রথীন কে স্পর্শ করলেও সে বুঝতে পারেনি, যখন সে বুঝতে পেরে পালানোর চেষ্টা করে, একটি বড় হাতি তাকে শুঁড়ে করে জড়িয়ে ধরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আমাদের ধারণা, ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়েছিল। ঘটনাস্থল থেকে আমরা মোবাইল ও হেডফোন পেয়েছি। প্রথমে রথীনের সঙ্গে যারা ছিল, তাদেরও খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। তবে, আমরা বিষয়টি মানবিক ভাবেই দেখে, উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে কাগজপত্র পাঠানোর কাজ করছি। যাতে, ক্ষতিপূরণের অর্থ (প্রায় চার লক্ষ) তার পরিবার অতি দ্রুত পেয়ে যায়।”

[ আরও পড়ুন -   রিপোর্ট কার্ড! বিধানসভা নির্বাচনের আগে উন্নয়নের খতিয়ান পেশ করল তৃণমূল ]

হাতির অবস্থান সম্পর্কে পাপন বাবু বললেন, “গত কয়েকদিন ধরেই, চাঁদড়া ও লালগড় রেঞ্জে প্রায় ৬০-৭০ টি হাতি থাকার খবর থাকলেও, পিড়াকাটা রেঞ্জে একটি মাত্র হাতি ছিল।‌ কিন্তু, চাঁদড়ার দিক থেকে ৩-৪ টি হাতি গতকালই একটি ১৬ টি হাতির দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হঠাৎ চলে আসে। সেই চারটি হাতিই গতকাল আমজোড়ের জঙ্গলে ছিল। রাতে সেগুলি মালিদা, ভীমপুর হয়ে লালগড়ের দিকে চলে গেছে। আমাদের মনে হয়, ভুট্টা ক্ষেতের কারণেই হাতিরা আকৃষ্ট হচ্ছে গ্রামের দিকে। ভুট্টার পরিবর্তে বিকল্প লঙ্কা চাষ, উচ্ছে চাষ‌ বা ঐ ধরনের কিছু করা যায় কিনা, গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।”

গ্রামবাসীদের সতর্ক করে তিনি এও জানালেন, “আমাদের বনকর্মীরা মানুষকে সচেতন করা থেকে শুরু করে, টহল দেওয়ার কাজ প্রতিনিয়ত করছে। কিন্তু, ওই এলাকায় এত বড় দুর্ঘটনা ঘটে যাবে বোঝা যায়নি। তবে সন্ধ্যার সময়, জঙ্গল লাগোয়া এই গ্রামগুলির রাস্তাতে এখন না বেরোনোই ভালো। কারণ, ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজি খেতে হাতিরা হঠাৎ হঠাৎ হানা দিচ্ছে।”

[ আরও পড়ুন -   শালবনীর নামকরা ব্যবসায়ী খোকা সিং এর রক্তাক্ত মৃতদেহ উদ্ধার ডেবরার কাছে জাতীয় সড়কে, নৃশংস ভাবে খুনের অভিযোগ ]
দ্য বেঙ্গল পোস্ট
দলমার দামালদের অতর্কিত হানায় প্রাণ গেল রথীন মান্নার :

এই বিষয়ে সাতপাটী (৭ নং) গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান পরিমল ধল জানালেন, “ভাবতেই পারছিনা এত বড় ঘটনা ঘটে যাবে! মাত্র কয়েকমাস আগেই লক্ষ্মী তার ছেলেকে নতুন মোবাইল কিনে দিয়েছে। যাই হোক, পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি এবং পাশে থাকার চেষ্টা করছি। সমস্ত কাগজপত্র আমরা রেডি করে পিড়াকাটার রেঞ্জ অফিসারের কাছে জমা দিয়েছি। সমব্যথী’র ২০০০ টাকাও ওরা পাবে; তবে ১৮ বছর বয়স হয়ে গেলে আরো কিছু ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা যেত। মাত্র এক মাস কম হওয়ায়, অন্যান্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা কতটুকু করা যাবে জানি না! তবে, চেষ্টা করা হবে।”

গ্রামবাসীদের বিকল্প চাষ করা নিয়ে পশুপ্রেমী ও পরিবেশকর্মী রাকেশ সিংহ দেব বললেন, “বিকল্প চাষ করা যেতে পারে। তবে সেটাও বেশিদিন কার্যকরী হবে বলে মনে হচ্ছে না! কারণ, মানুষের পর হাতিই সবথেকে বুদ্ধিমান প্রাণী। কিছুদিন পর তারা নিজেরাই নিজেদের খাদ্যাভ্যাস বদলে ফেলবে! তাই সচেতনতাই একমাত্র প্রতিরোধ হতে পারে। হাতির কাছে যাওয়া বা হাতিকে বিরক্ত করা থেকে দূরে থাকতে হবে।”