সীতাদেবীকে নিয়ে আকাশপথে পাড়ি দেওয়া রাবণের ‘পুষ্পক রথ’ই কি প্রথম ‘আকাশযান’? উত্তর খুঁজবে খড়্গপুর আইআইটি

.

দ্য বেঙ্গল পোস্ট বিশেষ প্রতিবেদন, খড়্গপুর IIT, ৮ নভেম্বর: রামায়ণের অরণ্য কাণ্ডে বর্ণিত হয়েছে, ঋষি ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে সীতাদেবী’কে ছলনা করে লঙ্কাধিপতি রাবণ আকাশপথে পাড়ি দিয়েছিলেন ‘পুষ্পক’ রথে করে। এই ‘পুষ্পক রথ’ই নাকি প্রথম পৌরাণিক আকাশযান বা বিমান! এই পুষ্পক রথ সম্পর্কে বর্তমান দিনের উইকিপিডিয়া (Wikipedia) ঘাঁটলেই জানা যায়, বিমানটি মূলত ধনৈশ্বর্যের দেবতা কুবেরের মালিকানাধীন হলেও, রাবণ সুবর্ণমণ্ডিত লঙ্কাপুরীসহ এই বিমানটিও তাঁর বৈমাত্রেয় জ্যেষ্ঠভ্রাতার থেকে ছিনিয়ে নেন। আবার অন্যান্য একাধিক গ্রন্থ থেকে তথ্য পাওয়া যায় যে, এই পুষ্পক বিমানটির নকশাকর ও সংরক্ষক ছিলেন অঙ্গিরা মুনি৷ আবার এই বিমানের নির্মাতা ও সাজসজ্জা করেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা, এমনটাও প্রচারিত বেশ কিছু পুরানে। যদিও, কিছু কিছু পুরাণে বলা হয়েছে- রাবণ নয়, রামচন্দ্রই প্রথম আকাশগামী রথের ব্যবহার করেছিলেন! পৌরাণিক সেই বিতর্ক আপাতত না বাড়িয়ে, এই আকাশগামী রথ বা ‘পুষ্পক রথ‘ এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়েই আলোচনায় প্রবেশ করা সমীচীন। আর এই আলোচনার সূত্রপাত দ্য বেঙ্গল পোস্ট বা কোনো সংবাদমাধ্যম হঠাৎ করে শুরু করছেনা, শুক্রবার (৬ নভেম্বর) থেকে শুরু হওয়া খড়্গপুর আইআইটি (Kharagpur IIT)’র আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার (International Webinar) “ভারত-তীর্থ” (Bharata-Tirtha) তেই উঠে এসেছে “পুষ্পক রথ” এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তির প্রসঙ্গটি! আর এই প্রসঙ্গটি যিনি উত্থাপন করেছেন, তিনি অন্য কেউ নন, আইআইটি খড়্গপুরের ডাইরেক্টর বা অধিকর্তা (Director of Kharagpur IIT) অধ্যাপক বীরেন্দ্র কুমার তিওয়ারি (Professor Virendra Kumar Tewari, সংক্ষেপে V. K. Tewari)।

thebengalpost.in
খড়্গপুর আইআইটি’র (Kharagpur IIT) ভারত-তীর্থ (Bharat-Tirtha) :

.
.
thebengalpost.in
Virendra Kumar Tewari (Kharagpur IIT) :

দেশের বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পীঠস্থান খড়্গপুর আইআইটি’র (Kharagpur IIT) অধিকর্তা অধ্যাপক ভি.কে তিওয়ারি চান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের এবং দেশের বিজ্ঞানীরা এই বিষয়টি গবেষণা করে দেখুন। কারণ তাঁর বিশ্বাস, “পুষ্পক বিমান কীভাবে উড়ত? নিশ্চয়ই কোনও বিজ্ঞান ছিল!” রামায়ণ অনুযায়ী, রাবণ তাঁর ভাই কুবেরের কাছ থেকে জোর করে এই পুষ্পক রথ কেড়ে নেন, যা আকাশপথে যাতায়াত করতে পারত। এই রথে সওয়ার হয়েই রাবণ সীতাকে হরণ করেছিলেন। আবার, রাম-রাবণের যুদ্ধের শেষে রাম-লক্ষ্মণ-সীতা এই রথে চেপেই আকাশপথে অযোধ্যা ফিরে এসেছিলেন। সেই রথ নিয়েই শুক্রবার অধ্যাপক তিওয়ারি প্রশ্ন তোলেন, “আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, এই পুষ্পক বিমান কি শুধুই গল্পগাথা নাকি এর পিছনে কোনও বিজ্ঞান ছিল?” আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রফেসর তিওয়ারি সংযোজন করেন, “আমাদের দেশের মুনি-ঋষিরা যা বলে বা করে গিয়েছেন, তাতে কিছু না কিছু তো ছিলই!” রামায়ণ-মহাভারত বা পুরাণে বিজ্ঞান কতটা ছিল, তা নিয়ে সুস্থ চর্চা আগেও হয়েছে, এখনও হতে পারে। কিন্তু, ২০১৪ হালে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর, আকাশগামী বা পুষ্পক রথ, গণেশের প্লাস্টিক সার্জারি, পৌরাণিক যুগে ইন্টারনেট বা ওয়াইফাই এর ব্যবহার (ধৃতরাষ্ট্রের কাছে সঞ্জয়ের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বর্ণনা) বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা আরো বেড়ে গেছে। ফলে, তা নিয়ে স্পষ্টত দুটো শিবির ভাগ হয়ে গেছে। একটি শিবির বিজ্ঞান খুঁজলেও, অন্য শিবিরের কাছে তা রঙ্গরসিকতার খোরাক হয়ে উঠেছে! বিখ্যাত বিজ্ঞানী বিকাশ সিনহা যেমন এদিন তিওয়ারির মন্তব্য শুনে বলেছেন, “এসব গল্পগাথা শুনিয়ে বিজ্ঞানচর্চাকে এক ভয়ঙ্কর দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আইআইটি খড়্গপুরে দেশের সেরা ছাত্রছাত্রীরা পড়তে আসে। স্বয়ং ডিরেক্টর তাঁদের এ সব কী শেখাচ্ছেন?” উল্টো দিকে, যোগেশচন্দ্র চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ পঙ্কজ রায় বলছেন, “প্রাচীন ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞানে এমন অনেক কিছু ছিল, যা পরে অনেক উন্নত দেশ গ্রহণ করেছে। এই অতিমারীর প্রতিরোধের কথাও আমরা চরক সংহিতায় পাই। কাজেই, কেউ যদি কোনও সম্ভাবনা অনুসন্ধান করে দেখার কথা বলেন, তাতে আপত্তি থাকার কিছু নেই!” উল্লেখ্য যে, এর আগেও পুষ্পক রথের আলোচনা নিয়ে, আলোচনা উঠে এসেছে ভারত এবং শ্রীলংকা দুই দেশের তরফেই। শ্রীলঙ্কাতো স্পষ্টত দাবিই করেছিল, রাইট ভ্রাতৃদ্বয় নয়, পৌরাণিক যুগেই প্রথম আকাশযান বা বিমান তৈরি হয়েছে, আর প্রথম পাইলট হলেন- রাবণ !

thebengalpost.in
রাবণের ‘পুষ্পক রথ’ :

thebengalpost.in
ঋষি ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে রাবণ :

.
thebengalpost.in
রাবণের অপহরণ সীতাদেবীকে :

প্রসঙ্গত, শুক্রবার (৬ নভেম্বর) থেকে আইআইটির উদ্যোগে শুরু হয়েছে তিন দিনের আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার। ‘ভারত-তীর্থ’ নামে এই ওয়েবিনারের মাধ্যমে প্রাচীন ভারতের জ্ঞানচর্চাকে তুলে ধরবে আইআইটি। এই ওয়েবিনারের উদ্বোধন করেছেন, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী রমেশ পোখরিয়াল নিশঙ্ক। তিনি ‘ভারত-তীর্থ’ সম্পর্কে বলেছেন, “আইআইটি খড়্গপুর বর্তমান সময়ে ভারতের ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলিকে অন্তর্নিবেশ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সেই চেষ্টায় ভারত তীর্থ ও গবেষণার মত উদ্যোগ সঠিক পদক্ষেপ।” তিনি, ‘পুষ্পক রথ’ এর আলোচনা প্রসঙ্গেও ভি.কে তিওয়ারিকে সমর্থন জানিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, “প্রধানমন্ত্রী যেমন ভারত দেখতে চান, সেটা আইআইটি খড়্গপুরে দেখা যাচ্ছে।” অধিকর্তার মন্তব্যে, সিলমোহর দিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, “তিওয়ারিজি যা বলছেন, তা অনুসন্ধান করে দেখা উচিত।” প্রাচীন জ্ঞানচর্চাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে তাই আইআইটি খড়্গপুরে সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম তৈরি করার কথা ঘোষণা করেন মন্ত্রী। যেখানে প্রাচীন ভারতের বেদ, উপনিষদ, পুরাণ সহ নানা প্রাচীন পুঁথিতে যে সব বিজ্ঞানের কথা লেখা আছে, তা নিয়ে গবেষণা করবে এই সেন্টার। তবে, সেখানে ভাস্করাচার্যের গণিত বা বরাহমিহিরের মতো প্রাচীন ভারতীয় স্কলারদের জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি “পুষ্পক বিমান” এর বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তিও খুঁজে বের করা হবে কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি এখনও!

thebengalpost.in
রাম-রাবণের যুদ্ধ শেষে পুষ্পক রথে করে অযোধ্যায় প্রত্যাগমণ :

thebengalpost.in
পুষ্পক রথে রামচন্দ্র ও সীতাদেবী :

.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে