“ওনারাই আমাদের কাছে ভগবান”, করোনা আক্রান্ত ও মৃতপ্রায় প্রৌঢ়াকে বিপদমুক্ত করে তোলা মকরামপুর ও শালবনীর চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে বললেন পুত্র

.

মণিরাজ ঘোষ, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১৪ অক্টোবর: অতিমারী’র মধ্যে এ যেন এক রূপকথার গল্প! হ্যাঁ, আবারো সেই রূপকথা গড়লেন, আমাদের সমাজের করোনা যোদ্ধা তথা স্বাস্থ্য যোদ্ধারা। আলাদা করে উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে হয়তো, পরোক্ষে তাঁদের কৃতিত্বকে খাটো করেই দেখানো হয়! কারণ, মারণ ভাইরাসের বিরুদ্ধে জীবন আর পরিবারের মায়া না করে প্রতিদিনই যাঁরা স্বাস্থ্য পরিষেবা বা চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে চলেছেন, তাঁরা তো প্রতিদিনই নতুন নতুন রূপকথা গড়ছেন। তবুও, কিছু ‘সত্য’ রূপকথার গল্পের মত পরিবেশন করতে কার না ভালো লাগে! পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার করোনা যুদ্ধে আজ তেমনই এক ‘মন ভালো করা’ রূপকথার গল্প শোনাবে দ্য বেঙ্গল পোস্ট। এ গল্পের পরিণতি (বা, সমাপ্তি পর্ব) হয়তো এখনো অজানা; তবুও গল্পের, প্রথম পর্ব আর দ্বিতীয় পর্ব আমাকে-আপনাকে মুগ্ধ করবে শুধু নয়; অনুপ্রাণিত করবে, উদ্বুদ্ধ করবে, হয়তোবা ভালো মানুষ হতেও শেখাবে।

thebengalpost.in
শালবনী করোনা হাসপাতাল :

.

১০ অক্টোবর, শনিবার সন্ধ্যে নাগাদ পশ্চিম মেদিনীপুরের মকরামপুর গ্রামীণ হাসপাতালে, ‘ব্রেন স্ট্রোক’ হওয়া অচৈতন্য এক প্রৌঢ়া’কে নিয়ে আসেন রোগীর পরিজনেরা। হাসপাতালে এক স্বাস্থ্যকর্মী, ফোন করে জানান হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডাঃ গৌরব দাস’কে। তিনি তখন নিজের কোয়ার্টারে, পরেরদিন (রবিবার) সকালে নিজের বাড়ি যাওয়ার জন্য জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন। বরাবরের মতোই, মকরামপুর গ্রামীণ হাসপাতালে সকলের প্রিয় এই তরুণ স্বাস্থ্য আধিকারিক (ডাঃ গৌরব দাস) স্বাস্থ্যকর্মীর ডাক (ফোন) পেয়েই ছুটে আসেন কয়েক মুহূর্তের মধ্যে। এর পরের ঘটনা চিকিৎসক ডাঃ গৌরব দাসের ফেসবুক ওয়াল বা টাইমলাইন থেকেই সংগৃহীত। এখানে তা হুবহু তুলে ধরা হল- “যেটুকু জানা গেল, তার সারবত্তা হলো, রুগী সকাল ১০টা অব্দি একদম সুস্থ, তাদের ঘর ভর্তি লোকজন… সব রকম কাজ নিজেই করতে পারেন…মহিলা রুগী, বয়স এই ৬০ এর গোড়ায়… হঠাৎ দুবার মতো বমি হয়, দুর্বল হয়ে পড়তে, পারিপার্শ্বিক একজন হাতুড়েকে দেখিয়ে কিছু ইনজেকশন আর স্যালাইন দেওয়া হয়… দুপুর তিনটে নাগাদ কথা বলতে বলতে আচমকা খিচুনি, বেশ কিছুক্ষণ ধরে মুখ থেকে গ্যাজা বেরিয়ে রুগী সম্পূর্ণ অজ্ঞান হয়ে যান….তারপর থেকে হুস নেই, লোকাল নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু বিশেষ কিছুই হয়নি…
জিজ্ঞেস করলাম রুগীর জ্বর ছিল, খিঁচুনির মতো কোনো রোগ আগে ছিল?? রেগুলার ওষুধ কিছু খেতেন?? প্রেসার- সুগার কিছু?? ‘না স্যার! কিছুই নেই…।’ মেপে দেখলাম প্রেসার নরমাল থাকলেও সুগারটা বেশ বেশি… কিছুক্ষন পরীক্ষা করে বললাম ‘স্ট্রোক’ হওয়ার সম্ভাবনা টাই বেশি, তবে, ব্রেনের সিটি স্ক্যান না হলে কিছু বলা যাচ্ছেনা…আমি যা যা দরকার এখন সব দিয়ে দিচ্ছি… তবে আপনাদের জানিয়ে রাখি, রুগী কিন্তু অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছেন… জীবন-মৃত্যুর মাঝে… জিসিএস স্কেলে ৮/১৫… আপনারা এই কিছু ওষুধ আমায় দিয়ে যান.. বাকি যা যা লাগবে আমি দিয়ে দিচ্ছি হাসপাতাল থেকে… .ওষুধ দেওয়া হলো, নাক দিয়ে নল ঢুকলো…ইউরিনারি ক্যাথেটার করা হলো.. বললাম আপনারা মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যান… ওখানে স্ক্যান হবে তারপর যা রিপোর্ট আসবে, সেই অনুযায়ী ডাক্তারবাবুরা চিকিৎসা করবেন….। এমনিতেই রাত হয়ে এসেছে বেশ… আমায় তখন রুগীর বাড়ির পরিজনরা জানায়, ‘ স্যার এত রাতে এম্বুলেন্স কোথায় পাবো… যদি আজ রাত টা থাকতে দেন… কাল নিয়ে যেতাম…।’ বললাম, ‘দেখুন সেটা রিস্ক তো বটেই… এখানে উপযুক্ত সব কিছু নেই…!’ ‘স্যার, আপনার কাছেই থাকুক… যা হওয়ার হবে…!’ অবশেষে বললাম, ‘আপনাদের মুখ চেয়ে রুগীকে রাখছি, আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করবো…।’ রুগী ভর্তি হলো, কাগজ পত্র-ওষুধ সব দেওয়া হলো…। কাজ সেরে নিজের কোয়ার্টারে যখন ফিরলাম… রাত ২ টো… ফোন আবার বেজে উঠলো… হাসপাতালের ডিউটিরত স্টাফ দাদা ফোন করেছেন…
‘হ্যাঁ দাদা বলো…’ ‘স্যার, পেশেন্টের ধুম জ্বর গায়ে, মেপে দেখলাম ১০৩.১°F…!’
‘আমি আসছি এক্ষুনি… ‘ মাস্ক, ফেস শিল্ড পরে ফের ছুটলাম….সোজা গিয়ে ফ্রিজে রাখা গুটিকয়েক কোভিডের এন্টিজেন টেস্ট কিটগুলোর থেকে একটা বের করে রুগীর কাছে গেলাম…
সলিউশন রেডি করে কিটে ৩-৪ ফোঁটা ঢালতেই মুহূর্তের মধ্যে পজিটিভ রেসাল্ট…!
স্টাফ দাদার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ালাম একবার…
পাশে দাঁড়ানো জনা ৫ রুগীর বাড়ির লোকের দিকে তাকিয়ে বললাম… ‘আপনাদের রুগীর কোভিড হয়েছে…!’ ”
এর পরে, চিকিৎসক গৌরব দাস তাঁর নিজের কাছে রাখা কোভিড ১৯ এর কিছু ‘কমন’ বা সাধারণ (Common) ওষুধপত্র দেন এবং সকাল হওয়়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে বলেন রোগীর পরিজনদের। সাত সকালেই, ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিকের সহায়তায়, শালবনী করোনা হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করার সাথে সাথে, রোগীর পরিজনদের সাহস প্রদান করেন এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন! নারায়ণগড় থানার বড়কলঙ্কাই গ্রামের মৃণালিনী অধিকারী (৬১)’র ছেলে স্বপন অধিকারী (৩৫)’র দু’চোখে তখন জল! না ভয়ের নয়, ভক্তি ও শ্রদ্ধার। এই পুরো কাহিনী’র অন্যতম সূত্রধর স্বপন বাবু দ্য বেঙ্গল পোস্ট‘কে জানালেন, “আমি ডাক্তার বাবু’ কে বলেছিলাম, স্যার আমার মা বেঁচে ফিরে আসুন বা না আসুন, আপনার ঋণ সারা জীবনেও আমরা শোধ করতে পারব না। আমরা তো ভেবেই নিয়েছিলাম, এই রাতটাই বোধহয় পেরোবেনা! উনি, আমাকে সাহস দিয়ে বলেন, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন, উনি ঠিক বেঁচে ফিরে আসবেন, আর এটা তো আমাদের কর্তব্য, এত ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। এই পুরো ঘটনার সাক্ষী এবং সর্বক্ষণ আমার পাশে ছিলেন, আমাদের গ্রামের গ্রামীণ চিকিৎসক বিনয় কুমার মাইতিও। উনিও অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন, গৌরব বাবু’র এই পরিষেবা ও আন্তরিকতায়।”

thebengalpost.in
চিকিৎসক গৌরব দাস (মকরামপুর গ্রামীণ হাসপাতাল) :

.

কাহিনী’র দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার লেভেল ফোর করোনা হাসপাতাল শালবনীতে। সম্প্রতি, যে হাসপাতাল আগের থেকে আরো উন্নত পরিকাঠামো ও ত্রুটিমুক্ত পরিষেবা নিয়ে, করোনা যুদ্ধে জেলাবাসীকে আশ্বস্ত করে চলেছে। সংকটজনক ওই কোভিড পজিটিভ রোগিনীর চিকিৎসা শুরু হয়। ভেন্টিলেশন (Ventilation), আইসিসিইউ (ICCU) প্রভৃতি সমস্ত ধরনের অত্যাধুনিক ও প্রয়োজনীয় পরিষেবা দিয়ে রোগিনীকে ক্রমে বিপদমুক্ত ও সুস্থ করে তোলা হয়। যদিও, শালবনীর চিকিৎসকেরা এখনই তা প্রকাশ করতে চাইছেন না, তাঁরা বলছেন, “একেবারে সুস্থ বলবো না, ওনার অবস্থা স্থিতিশীল। আগের থেকে অনেক ভালো।” একই কথা বললেন, তাঁর ছেলে স্বপন অধিকারীও, “আমার মা ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছেন। ভিডিও কলিংয়ে আজকেই দেখলাম, উনি অনেকটাই সুস্থ। যাই হোক, যেটুকুই হোক, এই দুই হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাছে আমি চির ঋণী হয়ে থাকব।” স্বপন বাবু শালবনী করোনা হাসপাতালের চিকিৎসক তথা শালবনীর ভারপ্রাপ্ত ব্লক মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক (BMOH) ডাঃ নবকুমার দাস, সুপার ডাঃ নন্দন ব্যানার্জি সহ সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী’দের ব্যবহার, আন্তরিকতা ও চিকিৎসা পরিষেবায় মুগ্ধ। সঙ্গে তিনি এও বললেন, “বর্তমানে রোগী সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে, যেভাবে আমরা রোগীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারছি, দেখতে পাচ্ছি এবং সারাদিনের তিন-তিনবার আপডেট পাচ্ছি, সেজন্য জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর সহ জেলা প্রশাসন এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই। একইসাথে, চিকিৎসক নবকুমার বাবু সহ সুপার কিংবা আমি যেসকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নাম জানিনা, তাঁদের সকলকেই ধন্যবাদ জানাই।”
এ এক এমন গল্প বা কাহিনী, যে কাহিনী সকলের সামনে আসুক, প্রকাশিত হোক, তা একযোগে চেয়েছেন, রোগীর (বা, মৃণালিনী দেবী’র) পরিজন (পুত্র স্বপন অধিকারী), শালবনী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর এবং জেলা প্রশাসন। স্বপন বাবু’র কথা দিয়েই পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার এই সত্য কাহিনী’র উপসংহার টানা হল, “এই কাহিনী সকলে জানুক, দয়া করে আপনারা এই কাহিনী তুলে ধরুন। তাতে করে অন্তত ওনাদের প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা কিছুটা সকলের সাথে ভাগ করে নিতে পারব। আমি গৌরব বাবু’র নম্বর যোগাড় করে ওনাকেও সব জানিয়েছি, পুনরায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছি এবং শালবনী করোনা হাসপাতালের চিকিৎসক ও বিএমওএইচ নবকুমার বাবু’র মাধ্যমে হাসপাতালের সকল চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর ও জেলা প্রশাসনের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছি। এরপর যা হবে ভগবানের হাতে। আমি নিজেও জরুরী পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। বিদ্যুৎ দপ্তরের কর্মী। তাই জানি, জরুরী পরিষেবা প্রদান করা ও সাফল্যমন্ডিত করা কতটা কঠিন!” আপাতত, এই কাহিনীর তৃতীয় তথা অন্তিম পর্বটিও (মৃণালিনী দেবী’র সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া) যেন মধুর হয়, সেই প্রার্থনায় আমরা সকলে। [পুনশ্চ : কোভিড রোগী বা তাঁর পরিবারের নাম ও তথ্য গোপন রাখা হয়। এই প্রতিবেদনের গুরুত্ব অনুযায়ী, নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, ঈষৎ পরিবর্তিত!]

thebengalpost.in
শালবনী করোনা হাসপাতাল :

.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে