শূণ্য হৃদয়েই নবমী নিশিকে বিদায় মেদিনীপুরের! মণ্ডপের রাশ ধরে রেখে ‘নায়ক’ উদ্যোক্তারাই, রাবণ বধেও নিয়ন্ত্রণ

.

মণিরাজ ঘোষ, মেদিনীপুর, ২৬ অক্টোবর: বিশে বিশে বিষক্ষয় নয়, বিশে বিশে ‘করোনা’র উদয়! ব্যতিক্রমী দু’হাজার বিশ (২০২০) কেবল বাঙালি বা ভারতীয় নয়, সারা বিশ্ব তথা মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক চরম অভিশাপ রূপেই আবির্ভূত হয়েছে! আর, বাঙালির কাছে শতাব্দীর সবথেকে ভয়ঙ্কর না হলেও, অন্যতম ভয়াবহ বছর! করোনা, আমফানে জর্জরিত বাংলা হারিয়েছে শিল্প, সাহিত্য, সমাজ ও রাজনীতির একাধিক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গকেও। সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসবেও পড়েছে প্রভাব। বার্তা ছিল- অতিমারী’র বিরুদ্ধে এ লড়াই শুধু করোনা যোদ্ধাদের নয়, এ লড়াই সবার! তাই, ‘সচেতনতা বজায় রেখে’ দুর্গোৎসব পালন করতে হবে। সেই লড়াইতে, পশ্চিম মেদিনীপুর তথা মেদিনীপুর বাসী আপাতত জয়ী হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। অষ্টমী ও নবমীর রাতে, অন্যান্য বছর যেখানে বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসের জন-জোয়ার আছড়ে পড়ে রাস্তাঘাট, পুজো মণ্ডপ কিংবা মণ্ডপ সংলগ্ন প্রতিটি মাঠে; এবার সেখানে ভিড় ও উচ্ছ্বাস দুইই নিয়ন্ত্রণে। যদিও, অষ্টমী পর্যন্ত গৃহবন্দি থাকা বেশিরভাগ মানুষ নবমী’র দিন আর নিজেদের ধরে রাখতে পারেননি! বেরিয়ে পড়েছেন, চিরন্তন আবেগের কাছে হার মেনে। তবে, এক্ষেত্রেও সবকিছুই নিয়ন্ত্রণে থাকল; কারণ দূরদূরান্ত থেকে মেদিনীপুর শহরে আসা মানুষের সংখ্যা নেহাতই কম বা প্রায় নেই বললেই চলে! আবার, মেদিনীপুর বাসীরাও আবদ্ধ থাকলেন মেদিনীপুর শহরেই, পা বাড়াননি খড়্গপুরের দিকে। তাই, রাস্তাঘাটে ভিড় থাকলেও, অন্যান্য বছরের তুলনায় নগণ্য! ভিড় ছিল রেস্টুরেন্টেও। তবে শুধুমাত্র অষ্টমী ও নবমী’র দিন। সেটাও আবার অন্যান্য বছরের মতো নয়, এমনটাই জানালেন কয়েকটি রেস্টুরেন্টের কর্তৃপক্ষ। তবে, মেদিনীপুর শহরের পুজো মণ্ডপ গুলি নিয়ন্ত্রণে রেখে, এবারের নায়ক যেন উদ্যোক্তা’রাই। মেদিনীপুর শহরের এক চিরন্তন আবেগ ও ঐতিহ্যের দুর্গোৎসব, বিধাননগর সর্বজনীনের দুর্গাপুজো। বিশাল মাঠের একটি অংশে প্রতিবছর নজরকাড়া প্যান্ডেল হয়, আর মাঠের বাকি অংশ জুড়ে দর্শনার্থীরা তথা যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণীদের ভিড়, আড্ডা, গল্প ও পুজোর আনন্দ গায়ে মাখা। এই দৃশ্যের সঙ্গেই এত বছর পরিচিত ছিল মেদিনীপুর ও আশেপাশের এলাকার মানুষ। কিন্তু, ব্যতিক্রমী এই নবমী নিশি সত্যিই মন খারাপ করে দেয়! ফাঁকা মাঠে, শুনশান পুজো মণ্ডপ। লাইন দিয়ে কিছু মানুষ দেবী দর্শন করতে যাচ্ছেন। বুকটা হাউ হাউ করে ওঠে! কিন্তু, উপায় নেই। এ লড়াই জিততে হবে, অতিমারী’কে হারাতে হবে।

thebengalpost.in
নবমীর রাতের দৃশ্য, শরৎপল্লীর একটি মণ্ডপের সামনে :

.
.

একই অবস্থা, রাঙামাটিতেও। শরৎপল্লী ও বার্জটাউনে কিছুটা ভিড় থাকলেও, অন্যান্য বছরের তুলনায় সীমিত! রবীন্দ্রনগর, ছোটো বাজার প্রভৃতি পুজো মণ্ডপের সংলগ্ন রাস্তাগুলি দিয়ে বাইক নিয়ে অন্যান্য বছর এগোনোই যেত না, এবার সেখানে বাইক নিয়েই দূর থেকে মণ্ডপ ও দেবীদর্শন করে মানুষ এগিয়ে গেছেন। এভাবেই নবমী নিশি কে বিদায় জানিয়ে, বিজয়ার মন খারাপ করা সকালে কিভাবে যে মানুষ পৌঁছে গেছেন, বুঝতেই পারেননি! অনেকে বলছেন, “কবে যে ষষ্ঠী এল, আর কিভাবে যে বিজয়াদশমী পড়ে গেল, এবার তা বুঝতেই পারলাম না!” রাবণ বধ (রাবণ দহন) এবং দশেরা উৎসবও এবার বন্ধ রেখেছেন, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বিভিন্ন পুজো উদ্যোক্তারা। কোথাও আবার কাটছাঁট করা হয়েছে আয়োজনে। ভিড় নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই বা স্বাস্থ্যবিধি ও প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পুজো উদ্যোক্তা তথা দুর্গোৎসব কমিটিগুলি। প্রশাসনের তরফ থেকে ৫০,০০০ টাকা করে পেয়েও আবেগ ও উচ্ছ্বাস এভাবেই নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন তাঁরা। তাই, ব্যতিক্রমী এই দুর্গোৎসব যথাযথভাবে পালন করে, নায়কের মর্যাদা পেতে পারেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পুজোর উদ্যোক্তা সকলেই।

thebengalpost.in
বিধাননগর পুজো মণ্ডপ নবমীর রাতে (রাত্রি ১০ টা, ২৫ অক্টোবর, ২০২০) :

thebengalpost.in
ভিড় ছিল রেস্টুরেন্ট গুলিতে, তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় কম :

.
.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে