অমৃতা দত্ত, মেদিনীপুর, ২৪ মে: আধুনিক যুগের চির-স্মরণীয় চলচ্চিত্র পরিচালক, কবি ও শিল্পী ঋতুপর্ণ ঘোষ লিখে গিয়েছেন- “মেঘ পিওনের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা…!” সময়টা মন খারাপের হলেও, ক্ষণ-জন্মা শিল্পী (দুই অর্থেই)’র প্রবল অনুরাগী মেদিনীপুরের এই দুই তরুণ শিল্পী ও সমাজকর্মী’র ব্যাগে কিন্তু “মন খারাপের দিস্তা” নেই, আছে ব্যাগভরা বিশুদ্ধ অক্সিজেন—বেঁচে থাকার একরাশ ভালোবাসা-প্রশ্বাস! হ্যাঁ, দুটো সাড়ে পাঁচ ফুটের অসীম ‘শক্তিশালী’ তরুণ, এই ভয়াবহ করোনা-যুদ্ধের প্রথম দিন থেকে দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধুমাত্র “প্রাণ-শক্তি” টুকু থাকলেই কত কি করা যায়! করে চলেছে ওরা, ছুটে চলেছে ওরা; ‘কিশোর কবি’ সুকান্তের “রানার” কবিতার ছন্দে ছন্দে ওরা ছুটে চলেছে ঘাড়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার চাপিয়ে, করোনা-আক্রান্তের দুয়ারে দুয়ারে। দিনের শেষে ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত! তবুও, ওরা অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রস্তুত, পরেরে দিনের জন্য। নতুন আহ্বানে সাড়া দিয়ে “প্রাণ-বায়ু” টুকু পৌঁছে দেওয়ার জন্য।


Whatsapp Group এ


ওরা দু’জন— নিসর্গ নির্যাস আর কৌশিক কঁচ। শহর মেদিনীপুরের সু-পরিচিত নাম, সু-পরিচিত মুখ। তরুণ কবি নিসর্গ দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রথম দিন থেকেই তার টিমের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে অক্সিজেন-ওষুধ সহ জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যস্ত। সময় নেই তার নিজের জন্য। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের “পদ্মানদীর মাঝি” উপন্যাসের কুবেরের মতো এই সময়টা তার ঘরে বসে থাকার নয়! ঘরে বসে কবিতা-গান-প্রতিবেদন লেখার জন্য অন্য কোন সময় বেছে নেবে সে! আর, কৌশিক? মেদিনীপুরের ‘বিস্ময়বালক’ বললেও কম বলা হয় বোধহয়! নীরবে, নিঃশব্দে নিজের কাজ (অন্যের জন্য) করে যাওয়া কৌশিক অবিভক্ত মেদিনীপুরের গর্বের প্রতিষ্ঠান “মেদিনীপুর ছাত্রসমাজ” এর সদস্য। প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন যেমন সক্রিয় মানবসেবায়, কৌশিক-ও ঠিক তাই। রাজকুমার, অনিমেষ, দীপেন, কৃষ্ণগোপাল’দের মানবসেবার ব্রতে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক রূপে বিরাজ করছে কৌশিক। করোনা সংক্রমিত’দের বাড়িতে বাড়িতে খাওয়ার, ওষুধ আর অক্সিজেন পৌঁছে দিচ্ছে সংকটকালের প্রথম দিন থেকেই! আর, এবার “কনফেডারেশন অফ পূর্ব অ্যান্ড পশ্চিম মেদিনীপুর ডিসিসিআই” (Confederation of Purba and Paschim Medinipur District Chamber of Commerce and Industry) এর “শ্বাস নাও” (মিশন ব্রেদ/Mission Breathe) সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের দুই স্বেচ্ছাসেবক বা “অক্সিজেন পিয়ন” হিসেবে, করোনা আক্রান্তের দুয়ারে দুয়ারে অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ঘাড়ে তুলে নিয়েছে বছর ২৫ এর এই দুই যুবক। রবিবার দুপুরে পিপিই কিট পরিহিত নিসর্গ ও কৌশিক অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার পর যখন তা খুলে, ঘর্মাক্ত দেহে নিজেরা একবার প্রাণ ভরে শ্বাস নিল, তখন বিদ্রোহী কবির সেই লাইনগুলিই যেন ওদের অব্যক্ত কন্ঠ হতে বেরিয়ে এলো- “মোদের পায়ের তলায় মূর্ছে তুফান (পড়ুন না, মহামারী)/ঊর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল!”











