করোনা যুদ্ধে এখনো পর্যন্ত তিন শতাধিক স্বাস্থ্য যোদ্ধা সংক্রমিত জেলায়, মৃত্যু ৩ জনের, যোদ্ধাদের জন্য হাসপাতাল আগামী সপ্তাহে

thebengalpost.in
শালবনী করোনা হাসপাতালের স্বাস্থ্য যোদ্ধারা (ফাইল ছবি) :
.

মণিরাজ ঘোষ, পশ্চিম মেদিনীপুর, ২০ সেপ্টেম্বর : করোনা’র বিরুদ্ধে “সম্মুখ সমরে” যাঁরা প্রাণ বিপন্ন করে লড়াই করে চলেছেন নিঃস্বার্থ ভাবে, তাঁদের মধ্যে প্রথম সারিতে নিঃসন্দেহে থাকবেন, স্বাস্থ্য যোদ্ধারা (Health Heroes)। নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার-পরিজনদের মায়া ত্যাগ করে, করোনা সংক্রমিত থেকে সাধারণ রোগাক্রান্ত সাধারণ মানুষকে তাঁরা স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়ে চলেছেন নিরন্তর। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার করোনা যুদ্ধে নিয়োজিত এই স্বাস্থ্যকর্মী (Health Heroes) দের মধ্যে এখনো পর্যন্ত প্রায় তিন শতাধিক (৩০০’র ও বেশি) ‘করোনা যোদ্ধা’ (Covid Warrior) সংক্রমণের কবলে পড়েছেন। এর মধ্যে, জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত আধিকারিক, চিকিৎসক, নার্স, এএন‌এম, আশাকর্মী এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য কর্মী সহ মোট ২৫৪ জনের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে, গতকাল অর্থাৎ (১৯ শে সেপ্টেম্বর) রবিবার পর্যন্ত। জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেই ২৫৪ জনের মধ্যে প্রায় ১১৩ জন এখনো চিকিৎসাধীন বা সক্রিয় করোনা আক্রান্ত। ইতিমধ্যে, সুস্থ হয়ে উঠেছেন প্রায় ১৪০ জন। মৃত্যু হয়েছে, বেলদা গ্রামীণ হাসপাতালের এক স্বাস্থ্যকর্মীর (গ্রুপ ডি কর্মী খোকন চন্দ্র সিং)! আক্রান্তদের এই তালিকায় খড়্গপুর মহাকুমা হাসপাতালের সুপার ডাঃ কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়, অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপার ডাঃ সোনালী আলু, শালবনী করোনা হাসপাতালের সদ্য প্রাক্তন সুপার তথা খড়্গপুর ‘পথের সাথী’ সেফ হোমের সদ্য নিযুক্ত সুপার ডাঃ অভিষেক মিদ্যা, ঘাটাল মহকুমা হাসপাতাল ও সেফ হোমের সুপার তথা ঘাটাল ব্লক মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ মনোজিৎ বিশ্বাস, চন্দ্রকোনা ১ নং এর বিএমওএইচ ডাঃ গৌতম প্রতিহার, পিংলা’র বিএমওএইচ ডাঃ উৎপল রায় সহ একাধিক স্বাস্থ্য আধিকারিক বা চিকিৎসকেরাও আছেন। এদিকে, জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের জেডএলও (Zonal Leprosy Officer) ডাঃ প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য সহ স্বাস্থ্য ভবনের (মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের কার্যালয়) মোট ১০ জন কর্মী সংক্রমিতের তালিকায় আছেন। অতিরিক্ত মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের কার্যালয়ের ১ জন কর্মীও আছেন সংক্রমিতের তালিকায়। তবে, সংক্রমিতের অধিকাংশ জনই উপসর্গহীন বা স্বল্প উপসর্গযুক্ত। তাই, যাঁরা এখনো চিকিৎসাধীন, তাঁদের বেশিরভাগ জন হোম আইসোলেশনেই আছেন। আর, যাঁরা সুস্থ হয়েছেন তাঁদের মধ্যেও অধিকাংশজন গৃহ নিভৃতবাসে থেকেই সুস্থ হয়েছেন। খুব অল্প সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী’কে করোনা হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।

thebengalpost.in
শালবনী করোনা হাসপাতালের স্বাস্থ্য যোদ্ধারা (ফাইল ছবি) :

.

অপরদিকে, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল সূত্রে রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) জানা গেছে, প্রায় ৫০ জনেরও বেশি চিকিৎসক, জুনিয়র চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা ইতিমধ্যে করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। স্বয়ং, মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডাঃ পঞ্চানন কুন্ডু গত ৮ সেপ্টেম্বর করোনা সংক্রমিত হয়েছিলেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি করোনা মুক্ত হয়েছেন এবং গতকালই (১৯ সেপ্টেম্বর) তিনি করোনা হাসপাতাল (আয়ুশ) থেকে ফিরে এসেছেন। আপাতত গৃহ নিভৃতবাসে (হোম আইশোলেশনে) আছেন এবং কয়েকদিনের মধ্যেই করোনা যুদ্ধে ফের যোগদান করবেন। রবিবার ডাঃ কুন্ডু জানিয়েছেন, “এই মুহূর্তে সংক্রমিতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা আমার হাতে নেই। দু’একদিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ একটি তালিকা প্রস্তুত করা হবে। তবে, সংখ্যাটা ৫০ জনের বেশিই হবে! করোনা যুদ্ধে, আমাদের হারাতে হয়েছে, একজন তরুণ ও প্রতিভাবান চিকিৎসক এবং একজন চালক তথা স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীকে!” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত ৭ সেপ্টেম্বর স্বয়ং, অধ্যক্ষের গাড়ির চালক কার্তিক চন্দ্র পটেলের মৃত্যু হয়েছিল, শ্বাসকষ্ট জনিত কারণে, মৃত্যুর পর তাঁর করোনা রিপোর্ট পজিটিভ এসেছিল। অপরদিকে, ৯ সেপ্টেম্বর জেলা হারিয়েছিল, প্রকৃত অর্থেই এক স্বনামধন্য চিকিৎসক তথা স্বাস্থ্য যোদ্ধা’কে! মেডিক্যাল কলেজের স্ত্রী রোগ ও প্রসূতি বিভাগের তরুণ চিকিৎসক ডাঃ এস এন বেরা মাত্র ৩৫ বছর বয়সেই করোনায় শহীদ হয়েছেন। জেলায় সবমিলিয়ে তাই, তিন শতাধিক স্বাস্থ্য যোদ্ধা এখনো পর্যন্ত করোনা সংক্রমিত হয়েছেন এবং ৩ জন করোনা যুদ্ধে ‘বীরগতি প্রাপ্ত’ হয়েছেন!

thebengalpost.in
খড়্গপুর পথের সাথী :

.

এদিকে, শুধুমাত্র ‘করোনা যোদ্ধা’ দের জন্য নির্মিত করোনা সেফ হোম বা নিরাপদ নিলয় আগামী সপ্তাহ থেকেই শুরু হয়ে যাবে বলে জানা যায়। খড়্গপুরের নিমপুরাতে অবস্থিত ‘পথের সাথী’ নামক সরকারি গেস্ট হাউসটিকে ৪০ শয্যা বিশিষ্ট ‘সেফ হোম’ রূপে গড়ে তোলার কাজ প্রায় সম্পূর্ণ! এই বিষয়ে ‘পথের সাথী’ সেফ হোমের নোডাল অফিসার তথা অতিরিক্ত মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ দেবাশীষ পাল জানিয়েছেন, “আশা করছি আগামী সপ্তাহ থেকেই শুরু করা যাবে। খুব সামান্য কয়েকটি কাজ বাকি আছে।” ডাঃ কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনা সংক্রমিত হওয়ার পর ডাঃ পাল’কে এখন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে খড়্গপুর মহাকুমা হাসপাতালের সুপারের দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে বলে জানা যায়, কারণ ‘করোনা মুক্ত’ হলেও এখনো গৃহ নিভৃতবাসে আছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপার ডাঃ সোনালী আলুও। এদিকে, শালবনী’র ব্লক মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক (BMOH) ডাঃ অভিষেক মিদ্যাকে আপাতত (সাময়িক) খড়্গপুরের “পথের সাথী সেফ হোম” এর সুপারের (Superintendent) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের জারি করা নির্দেশিকা অনুযায়ী, ডাঃ মিদ্যা’কে অবিলম্বে খড়্গপুরের নিমপুরাতে (পথের সাথী) নবনির্মিত সেফ হোমের সুপারের দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। যদিও, তিনি এখন হোম আইশোলেশনে আছেন বলে জানা গেছে স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে। গত ১২ আগস্ট তাঁর করোনা রিপোর্ট পজিটিভ এসেছিল। তবে, তিনি উপসর্গহীন বলে জানা গেছে। ডাঃ মিদ্যা এর আগে, শালবনী করোনা হাসপাতালের দায়িত্বে ছিলেন। সেই দায়িত্ব থেকে সম্প্রতি তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে, শালবনী করোনা হাসপাতালের সুপার ডাঃ নবকুমার দাস। ডাঃ মিদ্যার অনুপস্থিতিতে তিনিই শালবনীর ব্লক মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের (BMOH) দায়িত্বও পালন করবেন বলে জানানো হয়েছে জেলা স্বাস্থ্য ভবনের পক্ষ থেকে।

.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে