ধীরে ধীরে কোভিড যুদ্ধ জয়ের পথে পশ্চিম মেদিনীপুর, শেষ সাতদিনে সংক্রমিত মাত্র ৩৩৮, করোনা হাসপাতালে ভর্তি মাত্র ৫৫ জন

বিজ্ঞাপন

মণিরাজ ঘোষ, পশ্চিম মেদিনীপুর, ৫ ডিসেম্বর: পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় প্রথম করোনা সংক্রমিতের সন্ধান মিলেছিল, গত ৩০ শে মার্চ (২০২০)। দাসপুর ১ নং ব্লকের, নন্দনপুর ১ নং গ্রাম পঞ্চায়েতের নিজামপুরে। মহারাষ্ট্র ফেরত বছর তিরিশের স্বর্ণশিল্পী গণেশ চন্দ্র জানা’ই এই জেলার প্রথম করোনা আক্রান্ত। এরপর, জেলার দ্বিতীয় ও তৃতীয় করোনা সংক্রমিত হিসেবে, তাঁর বাবা ও স্ত্রী’র রিপোর্টও পজিটিভ এসেছে। তবে, ধাপে ধাপে তাঁরা প্রত্যেকেই (এপ্রিল মাসে) সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এরপর, এই জেলাতেও এক-এক করে বেড়েছে সংক্রমণ। প্রথম প্রথম করোনা সংক্রমিতদের বেলেঘাটা আই.ডি এবং পরে, পূর্ব মেদিনীপুরের বড়মা হাসপাতালে পাঠানো হলেও, ধাপে ধাপে এই জেলাতেও করোনা হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়েছে। ১ লা এপ্রিল থেকে আয়ুশ এবং তারপর, শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতাল (গ্লোকাল) কে যথাক্রমে লেভেল – ১ এবং লেভেল- ২ হিসেবে গড়ে তোলা হলেও, সেখানে সংক্রমিত’দের চিকিৎসা হতো না। শুধুমাত্র, সন্দেহভাজন বা সাসপেপ্টেডদেরই রাখা হতো। জেলার লেভেল ফোর করোনা হাসপাতাল হিসেবে প্রথম পথচলা শুরু, শালবনী সুপার স্পেশালিটি’র। ১৭ ই জুন থেকে সেখানে চিকিৎসা শুরু হয়। সেই সময় অবশ্য জেলায় প্রতিদিন ২-৪ জন করে করোনা আক্রান্ত হচ্ছিলেন এবং ১৫ ই জুন পর্যন্ত জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ২ জনের (রাজ্যের করোনা বুলেটিন অনুযায়ী)। যাইহোক, শালবনী করোনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রথম ৫ জন রোগী মাত্র পাঁচদিনের মধ্যে (২২ জুন) সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান। সকলেই ছিলেন দাসপুর এলাকার। তালিকায় ছিল, ৫ বছরের এক শিশুকন্যাও। এরপর, নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে শালবনী করোনা হাসপাতাল। প্রথম দু’মাস (জুন-জুলাই) সংক্রমণের চাপও সেভাবে ছিল না, আর শালবনী করোনা হাসপাতালও সঠিক ও সুন্দর ভাবে পরিষেবা দিয়ে গেছে। কিন্তু, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী হয়, আগস্ট থেকে।

thebengalpost.in
মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের HDU SARI UNIT :

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই আগস্ট থেকেই, মৃত্যু সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে। ৩১ শে জুলাই পর্যন্ত পশ্চিম মেদিনীপুরে মোট মৃত্যু সংখ্যা ছিল ২৩ এবং মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০০০ (জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী)। সেই সংখ্যা, ৩১ শে আগস্ট বেড়ে হয়, যথাক্রমে- ৬৬ ও ৪১৪৪। অর্থাৎ, মাত্র একমাসের মধ্যে মৃত্যু ও সংক্রমণের সংখ্যা ভয়াবহ ভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এরমধ্যেই, বিতর্ক চরমে ওঠে, গত ২১ শে আগস্ট, শালবনী করোনা হাসপাতালে এক চিকিৎসাধীনের আত্মহত্যা’কে কেন্দ্র করে। ওই সময় শালবনী করোনা হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা নিয়েও প্রশ্ন উঠে যায়! এদিকে, হু হু করে বাড়তে থাকে জেলার করোনা সংক্রমণ। প্রতিদিন শতাধিক করোনা সংক্রমণ এবং ৫-৬ জনের মৃত্যু! এরপরই নড়েচড়ে বসে, জেলা ও রাজ্য প্রশাসন। রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশক্রমে একাধিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর তথা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায়। করোনা যুদ্ধে নতুন করে ঝাঁপিয়ে পড়েন, জেলার স্বাস্থ্য যোদ্ধারাও। শালবনী করোনা হাসপাতালের আমূল পরিবর্তন হয়। ভেন্টিলেশন, এইচডিইউ, ডায়ালিসিস ইউনিট সহ অক্সিজেন সিস্টেম উন্নত করা হয়। সর্বোপরি, একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসক নিযুক্ত হন। উন্নত করা হয়, আয়ুশ হাসপাতালটিকেও। একাধিক সেফ হোম গড়ে তোলা হয়। ফলস্বরূপ, সেপ্টেম্বর শেষ সপ্তাহ থেকেই করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসে। উঠে যাচ্ছে একের পর এক সেফ হোম (আয়ুশ স্যাটেলাইট, ডেবরা প্রভৃতি)। জেলার করোনা যুদ্ধে, সর্বশেষ সংযোজন, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে একটি সর্বোৎকৃষ্ট মানের এইচডিইউ-সারি ইউনিট (HDU SARI UNIT)। আগামী দিনে, লেভেল ফোর শালবনী এবং মেডিক্যাল কলেজেই হয়তো করোনা চিকিৎসা হবে, বাকি সবগুলিই ধাপে ধাপে বন্ধ হয়ে যাবে। স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রেও তেমনই ইঙ্গিত মিলেছে।

thebengalpost.in
কোভিড যুদ্ধ জয়ের পথে পশ্চিম মেদিনীপুর :

বিজ্ঞাপন

এই মুহূর্তে, জেলায় সুস্থতার হার বেড়ে হয়েছে ৯৬ শতাংশ। ৪ ঠা ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলায় মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা হল- ১৬,২০১। ৯৬ শতাংশ হারে ইতিমধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন, ১৫,৪৭৬ জন। মৃত্যু হয়েছে ২৩৯ জনের। চিকিৎসাধীন আছেন মাত্র ৪৮৬ জন। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, ৪৮৬ জন‌ সক্রিয় করোনা আক্রান্তের মধ্যে করোনা হাসপাতাল গুলিতে চিকিৎসাধীন আছেন মাত্র ৫৫ জন। এর মধ্যে, ২০০ শয্যার শালবনীতে চিকিৎসাধীন মাত্র ১৪ জন (৪ ঠা ডিসেম্বরের তথ্য), আয়ুশ হাসপাতালে ২১ জন, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের HDU SARI UNIT এ ১৫ জন এবং ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালের সেফ হোমে ৫ জন চিকিৎসাধীন আছেন। বাকিগুলি রোগী-শূণ্য! গত ৭ দিনে জেলায় করোনা সংক্রমিত হয়েছেন মাত্র ৩৩৮ জন। ২৮ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা যথাক্রমে- ৬০, ৩৬, ৩৭, ৫২, ৬১, ৪৬ এবং ৪৬। সবমিলিয়ে, গত আট মাসের করোনা যুদ্ধের অন্তিম পর্যায়ে, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা যে রীতিমতো স্বস্তিতে রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য!

বিজ্ঞাপন

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে