দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ৮ মে: মহামারীর দ্বিতীয় অভিঘাতে বড্ড অসহায় পড়েছে মানুষ! দেশে ও রাজ্যে শ’য়ে শ’য়ে মানুষ মারা যাচ্ছেন শুধু সঠিক সময়ে অক্সিজেন টুকু না পাওয়ার কারণে! মারণ ভাইরাসের ভয়াল সংক্রমণের মুখে, দেশজুড়ে সৃষ্টি হওয়া প্রবল অক্সিজেন সঙ্কটের মধ্যেও এখনও যে সমস্ত জেলাগুলি তুলনামূলক ভালো অবস্থায় আছে, তার মধ্যে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা অন্যতম। এখনও পর্যন্ত জেলা প্রশাসন কিংবা জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে অক্সিজেন সঙ্কটের বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে! প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, জেলায় এখনও পর্যন্ত পর্যাপ্ত অক্সিজেন আছে। তবে, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় জেলার ৫ টি সরকারি হাসপাতালে দ্রুত ৬ টি অক্সিজেন প্ল্যান্ট বসানো হবে বলেও জানা গেছে। আগেই নির্ধারিত হয়েছিল, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে একটি অক্সিজেন প্ল্যান্ট তৈরি হবে। কিন্তু, জেলাশাসক ডঃ রশ্মি কমলের নেতৃত্বে, শুক্রবার জেলা টাস্ক ফোর্সের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে ২ টি এবং খড়্গপুর, ঘাটাল, ডেবরা ও শালবনীতে ১ টি করে প্ল্যান্ট তৈরি করা হবে। এই বিষয়ে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ তথা জেলা টাস্ক ফোর্সের অন্যতম সদস্য ডাঃ পঞ্চানন কুন্ডু জানিয়েছেন, “জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের পক্ষ থেকে দুটি প্ল্যান্ট করা হবে। জায়গা চিহ্নিতকরণ হয়েছে। দ্রুত কাজ শুরু হবে।” কিন্তু, কবে কাজ শুরু হবে, তা তিনি জানাতে পারেননি। জেলার জনস্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ শ্যামপদ পাত্র বললেন, “সোমবার এই বিষয়ে জেলাশাসক এবং জেলার স্বাস্থ্যকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসছি।” জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৫ টি সরকারি হাসপাতালে দ্রুত এই ৬ টি প্ল্যান্ট গড়ে তোলা হবে। জেলার উপ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ সৌম্যশঙ্কর সারেঙ্গী জানিয়েছেন, “মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের ২ টি অক্সিজেন প্ল্যান্ট তৈরি করবে জনস্বাস্থ্য ও কারিগরী দপ্তর। জেলার অন্য চারটি হাসপাতালে অর্থাৎ ডেবরা সুপার স্পেশালিটি, ঘাটাল সুপার স্পেশালিটি, শালবনী সুপার স্পেশালিটি এবং খড়্গপুর মহকুমা হাসপাতালের প্ল্যান্ট গুলি তৈরি করবে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ। এই বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তরফে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।”


Whatsapp Group এ

অন্যদিকে, মহামারী কবলিত পশ্চিম মেদিনীপুরে এখনও পর্যন্ত ‘পর্যাপ্ত অক্সিজেন’ এর যোগান থাকা সত্ত্বেও, বাস্তবে রোগী ও রোগীর পরিজনদের কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে! যে, অক্সিজেন সিলিন্ডার (১০ লিটারের) ভরতে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হত, এখন তা ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকার বিনিময়ে ভাড়া নিতে হচ্ছে। সিলিন্ডারের অভাবে অনেক সময় তাও পাওয়া যাচ্ছে না। উপায় না থাকায় কেউ কেউ ৩০০০-৪০০০ টাকা দিয়ে ১০ লিটারের সিলিন্ডার ভাড়া নিচ্ছেন! সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালেও ধীরে ধীরে সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। এ তো গেল অক্সিজেন ইতিকথা! অতিমারীর এই পরিস্থিতিতে, ২০ কিলোমিটার অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে (করোনা পজিটিভ রোগী হলে)! প্রয়োজনের সময়ে তাও পাওয়া যাচ্ছেনা। আর, এই বিষয়ে অ্যাম্বুলেন্স কর্তৃপক্ষের সাফাই, “জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চালক যাবে, গাড়ি স্যানিটাইজ করতে হবে!” নিরূপায় রোগীর পরিজনেরা তাই দিয়ে দিচ্ছেন, শুধুমাত্র এই মারণ ভাইরাসের হাত থেকে নিজের প্রিয়জনকে বাঁচানোর তাগিদে। প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা বিল জানা সত্ত্বেও, অনেকেই বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করতে চাইছেন প্রিয়জনদের। কিন্তু, কর্তৃপক্ষের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, “বেড নেই, ফাঁকা হলে ফোন করে জানিয়ে দেব।” অন্যদিকে, জেলার সরকারি হাসপাতালে, HDU (সঙ্কটজনক রোগীদের ক্ষেত্রে) এবং ICCU/CCU (অতি সঙ্কটজনক রোগীদের ক্ষেত্রে) বেডের অভাব! শালবনীতে ৫০ টি ও মেদিনীপুর মেডিক্যালে ২৬ টি HDU বেড আছে এই মুহূর্তে। সাধারণ বেড ফাঁকা থাকলেও, এই ৭৬ টি বেডের ৭০ থেকে ৭২ টি (কোনো কোনো সময় ৭৬ টিই) সবসময় ভর্তি থাকছে। জেলার স্বাস্থ্য আধিকারিক থেকে শুরু করে করোনা হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, “প্রথম ঢেউয়ের তুলনায় দ্বিতীয় ঢেউয়ে সঙ্কটজনক রোগী অনেক বেশি। সব বয়সের করোনা আক্রান্তরাই এবার সঙ্কটজনক হয়ে পড়ছেন দ্রুত!” সবমিলিয়ে, জঙ্গলমহলের এই জেলাতেও এখন অতিমারী বিভীষিকা প্রবল থেকে প্রবলতর আকার ধারণ করছে! তাই, আগামী দু’এক মাস জেলাবাসীকে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।









