কৃত্রিমতার যুগেও মেদিনীপুরে হারিয়ে যায়নি ‘সাবেকিয়ানা’, শালবনীতে গৌর-নিতাইয়ের পরিবারে ‘কমলা’ রূপে স্বয়ং দেবী আবির্ভূতা

thebengalpost.in
পশ্চিম মেদিনীপুরে এখনো ঘটা করে পালিত হয় কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমা :
.

পলাশ খাঁ ও অমৃতা ঘোষ, পশ্চিম মেদিনীপুর, ৩০ অক্টোবর: ব্যস্ততা আর কৃত্রিমতার যুগেও হারিয়ে যায়নি সাবেকিয়ানা! তাই, এখনো মফস্বল শহর মেদিনীপুর ও তার আশপাশের গ্রামগুলিতে ঘটা করে আজও আলপনা দিতে বসেন মা-কাকিমারা। কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমা বাঙালির প্রাণের উৎসব। দুর্গাপুজোর পর কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমা’তে বাঙালির ঘরে ঘরে যেন মা দুর্গা স্বয়ং অন্নপূর্ণা রূপে ফের পূজিতা হতে আসেন। তাই, প্রাণের ডালি সাজিয়ে বাংলার গৃহলক্ষ্মীরা মা লক্ষ্মী’র আবাহন করেন। উঠোন থেকে গৃহকোণ পর্যন্ত আলপনার পারিপাট্যে দেবী’কে বরণ করে নেওয়া হয়। না, কৃত্রিম স্টিকার বা আধুনিক কেনা ছাপ দিয়ে নয়, বাংলার গৃহলক্ষ্মীরা চালের গুঁড়ো ভিজিয়ে তুলি কিংবা অঙ্গুলি দিয়ে আলপনা আঁকেন হৃদয়ের রঙে রাঙিয়ে। সেই, সৌন্দর্য বা সাবেকিয়ানা যে ধীরে ধীরে লুপ্ত হচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই! ব্যস্ততা, কৃত্রিমতা আর আধুনিকতার যুগে হারানো সে সব সৌন্দর্য আজ স্মৃতির খাঁচায় বন্দী হয়ে যাচ্ছে কেবল! তবে পুরোপুরি তা হারিয়েও যায়নি। জেলাশহর মেদিনীপুরেরই আশেপাশে এখনো ঘটা করে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা সম্পন্ন হয়, আলপনা দেন বাড়ির গৃহলক্ষ্মী তথা মা কাকিমারা। কচিকাঁচারাও এগিয়ে আসেন সোৎসাহে। মেদিনীপুর শহরের উপকণ্ঠে খয়রুল্লাচকে আজ (৩০ অক্টোবর), লক্ষ্মী পুজোর দিন দেখা মিলল তেমনই সব অপূর্ব আলপনা বা কারুকার্যের। মেদিনীপুর শহর ছাড়িয়ে শালবনী, কেশপুর, গড়বেতা, চন্দ্রকোনা, ডেবরা, সবং, নারায়ণগড়, খড়্গপুর গ্রামীণ ব্লকের বিভিন্ন গ্রামেও পাড়ি দিলে দেখা মিলবে, গৃহলক্ষ্মীদের মঙ্গল করে অঙ্কিত অপূর্ব সুন্দর আলপনা কিংবা তিন দিন ধরে চলা লক্ষ্মীপূজো ও অষ্টম প্রহরের। দেখা মিলবে, কৃত্রিমতা নয়, সাবেকিয়ানায় পরিপূর্ণ কোজাগরী লক্ষ্মী পূজো।

thebengalpost.in
মেদিনীপুর সদর ব্লকের খয়েরুল্লাচকে :

.
.

শালবনীর গোদাপিয়াশালের জমিদারের নায়েব ছিলেন চৈতা গ্রামের রাধেশ্যাম দুয়ারী। তাঁর দুই পুত্র গৌর ও নিতাই। শালবনীর বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের জমিজমা ছিল। বাইরের জমির দেখাশুনো করতেন বড়ো পুত্র গৌর। আর বাড়ি দেখাশুনো করতেন ছোটো পুত্র নিতাই। জমিদারী প্রথা উঠে যাওয়ার পর, তাঁদের জমিজায়গা বে-দখল হয়ে পড়ে! ফলে নায়েবি চলে যায়। নায়েবি চলে গেলেও তাঁদের ‘নায়েবিয়ানা’ তখনও বজায় ছিল। কিন্তু, কালের নিয়মে শুরু হয় অর্থনৈতিক সংকট । ফলে, নিতাই বাবু সরকারী চাকুরী নিয়ে কলকাতায় থাকতে শুরু করেন একাই।

thebengalpost.in
মেদিনীপুর সদর ব্লকের খয়েরুল্লাচকে :

.

এদিকে, রাধেশ্যাম দুয়ারী দুই ছেলের বিয়ে দেন। নিতাই ও তিলকার এক কন্যা ও তিন পুত্র। গৌর ও জ্যোৎস্না’র পাঁচ কন্যা ও এক পুত্র। দুয়ারী পরিবারে লক্ষ্মী পুজো শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। নিষ্ঠাভরেই পুজো হয়ে আসছিল। পুজো শুরু হওয়ার দুই বছরের মাথায় দুই ভাইয়ের একটি করে কণ্যা সন্তানের জন্ম হয়। কন্যাদ্বয়ের তখন দুই বছর বয়স। সবে ছোটো ছোটো পায়ে হেঁটে বেড়াতে শুরু করেছে৷ লক্ষ্মী পুজো ঠিক দিন পনেরো আগে ঘটে গেল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা! বাড়িতে সকলেই যখন কাজে ব্যাস্ত ছিল, সেই সময় সকলের অলক্ষ্যেই নিতাইয়ের একমাত্র কন্যা কমলা বাড়ির অদূরে একটি পুকুরের জলে ডুবে মারা যায়। বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসে! বাড়িতে ওই সময় কোনো পুরুষ মানুষ ছিলেন না। নিতাই বাবু কলকাতাতে থাকতেন কর্মসূত্রে। আর, জমি জায়গার বিষয়ে সেদিন গৌর বাবুও বাড়িতে ছিলেন না। পরের দিন, গৌর বাবু বাড়িতে ফিরে এসে কমলার মৃত্যুতে শোকে পাগল হয়ে প্রতিজ্ঞা করে বসেন যে যদি লক্ষ্মী পুজোর দিনই বাড়িতে নতুন অতিথির আগমন ঘটে, তখনই আবার লক্ষ্মীর আরাধনা করা হবে, তার আগে নয়! তখন থেকেই দুয়ারী বাড়িতে ধন দেবীর আরাধনা বন্ধ থাকে। দেখতে দেখতে বছর কেটে যায়। অন্তঃসত্ত্বা হয় নিতাইয়ের স্ত্রী তিলকা।

thebengalpost.in
চৈতার দুয়ারী পরিবারের মা লক্ষ্মী :

এক বছর পর লক্ষ্মী পুজোর দিনই সকালে গৌর দুয়ারী স্থানীয় পিড়াকাটা বাজারে গিয়ে নিজের অজান্তেই মেয়ের জন্য প্রচুর ফল কিনে নিয়ে বাড়িতে গেলে, পাঁচ বছরের মেয়ে দীপালি বাবার কাছে জানতে চায় এত ফল কি হবে। দীপালি কে তার বাবা জানায়, পুজো হবে। কিন্তু, কি পুজো হবে আর ঠাকুরই বা কোথায়, মেয়ে বাবার কাছে জানতে চায়। এমন সময় হঠাৎ করেই তিলকা প্রসব যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকে! স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানেই তিলকা জন্ম দেয় এক শিশু পুত্রের। গৌর দুয়ারীর প্রতিজ্ঞা ছিল, লক্ষ্মী পুজোর দিন যদি কোনো নবজাতকের জন্ম হয়, তবেই বাড়িতে ফের শুরু হবে লক্ষ্মী পুজো। এদিকে নিয়তির নিজস্ব ইচ্ছায়, গৌর তার মেয়ে দীপালি’কে জানায় বাড়িতে পুজো হবে। ফলে ধনদেবীর আরাধনার তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। কিন্তু, পুজোর মাত্র হাতে কয়েক ঘন্টা বাকি! কিভাবে পুজো হবে?

thebengalpost.in
চৈতার দুয়ারী পরিবারের মা লক্ষ্মী :

গৌর বাবু নিজেই শালবনী ব্লকের সাতপাটি থেকে মাত্র সাত টাকায় প্রতিমা কিনে এনে পুজো শুরু করেন। সেই থেকেই দুয়ারী পরিবারে লক্ষীপুজো শুরু হয়। যা এখনো নিয়ম নিষ্ঠা ও ভক্তি সহকারে চলে আসছে। দুয়ারী পরিবারে লক্ষ্মীকে সেদিন থেকেই কন্যারুপে পুজো করা হয়। দুয়ারী পরিবারে ধনদেবীকে কন্যা কমলা রুপে পুজো করা হলেও, নিষ্ঠার কোনো অভাব থাকেনা! দুয়ারী পরিবারের এক সদস্য রামকৃষ্ণ দুয়ারী জানান, “আমরা তখন খুবই ছোটো ছিলাম, একবছর পুজোর বিসর্জন নিয়ে কিছু অনিয়ম হয়ে যাওয়ার কারণে, বাড়িতে আগুন লেগে যায়! বড়রা বলতেন, অনিয়মের জন্যই মায়ের কোপে পড়তে হয় তাঁদের। তারপর থেকে কোনোরুপ ত্রুটি রাখা হয় না পুজোতে!”

thebengalpost.in
পশ্চিম মেদিনীপুরে এখনো ঘটা করে পালিত হয় কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমা :

দুয়ারী পরিবারের পুজো এই বছর ৪৩ বর্ষে পড়লো। তিন দিন ধরে চলে পুজো। তিন দিন আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা সকলেই একত্রিত হয় বলে জানান এই পরিবারের আরেক সদস্য মৃন্ময় দুয়ারী৷ তিনি আরো জানান, “এখনো পুজোর দিন মা জ্যেঠিমা সারাদিন উপোশ করে থাকেন। পুজোর নিয়ম নিষ্টা তারাই আমাদের শিখিয়ে দেন।” আর প্রায় ৮০ ছুঁইছুঁই জ্যোৎস্না, তিলকারা বয়সের ভরে কাবু হলেও পুজোর তিন দিন তাঁদেরই যেন ব্যাস্ততা সবচেয়ে বেশী। তবে, এবার করোনার কারণে, পুজো হবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে। এবার বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন আসছেন না। এমন কি পরিবারের সদস্য সহ পুজোর সঙ্গে যুক্ত সকলেরই মাস্ক ব্যাবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিদিন মন্ডপ জীবাণুমুক্ত বা স্যানিটাইজ করা হবে। ফলে, এবার আড়ম্বরপূর্ণ পুজো নয়, বরং এবার দুয়ারী পরিবারে পুজো হবে সতর্কতামূলক।

.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে