আবারও প্রিয়জন বিয়োগ মেদিনীপুরের! কোভিড কেড়ে নিল সঙ্গীত জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র হায়দার আলী’কে

বিজ্ঞাপন

মণিরাজ ঘোষ, মেদিনীপুর, ১০ ডিসেম্বর: “সহে না যাতনা…../একে একে সব আশা ঝ’রে ঝ’রে প’ড়ে যায়/সহে না যাতনা!” সাল শুরুর সন্ধিক্ষণে সকলেই ভেবেছিলেন, বোধহয় ‘বিশে বিশে বিষক্ষয়’ হতে চলেছে ২০২০’তে! ভালো কিছু নিয়ে আসতে চলেছে এই সাল। হল ঠিক তার উল্টো! সারা বিশ্ব থেকে আমাদের বাংলা, শুধুই দুঃখ-বিরহ-যন্ত্রণার অবিরাম অভিঘাত! অতিমারী, আম্ফান, একাধিক নক্ষত্র পতন, প্রিয়জন বিয়োগে এই সালের প্রতিটা সকাল যেন “রাতের চেয়েও অন্ধকার!” বাংলার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-বিনোদন ও রাজনৈতিক জগতে ঘটেছে একের পর এক ইন্দ্রপতন! ‘ভারতরত্ন’ বঙ্গসন্তান প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মহাপ্রয়াণের (৩১ আগস্ট), মাত্র তিন মাসের মধ্যে “দাদাসাহেব ফালকে” সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (১৫ নভেম্বর)। দীপাবলিতেই বঙ্গজীবনে নেমে এসেছিল ঘোর অমানিশা! ঠিক এক সপ্তাহ পরে (২২ নভেম্বর), মেদিনীপুর হারিয়েছিল সংস্কৃতি জগতের অন্যতম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক পার্থসারথি শ্যাম’কে। মাত্র পঞ্চাশেই কোভিড কো-কোর্বিডিটি কেড়ে নিয়েছিল তাঁর প্রাণ! তার আগে অবশ্য কোভিড সহ নানা দুর্ঘটনা মেদিনীপুরের একাধিক প্রিয় মানুষকে কেড়ে নিয়েছে। শিক্ষক আশিস কর (মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল), ডাক্তার অমল রায় (বীরভূম জেলা হাসপাতাল), আইনজীবী সমরেন্দ্র নাথ দাস (মেদিনীপুর জর্জ কোর্ট), সাংবাদিক ও উদ্যোগপতি সুবীর সামন্ত (স্যাটলিঙ্ক মেদিনীপুর) প্রমুখরা বিদায় নিয়েছেন স্মৃতি টুকু ছড়িয়ে দিয়ে। এবার বিদায় নিলেন, অবিভক্ত মেদিনীপুর শুধু নয়, জেলা ছাড়িয়ে সারা রাজ্যের সঙ্গীত জগতের অন্যতম পরিচিত মুখ হায়দার আলী! মাত্র পঞ্চাশেই (৫২), মেদিনীপুর বাসীকে কাঁদিয়ে তিনিও চলে গেলেন আজ (১০ ডিসেম্বর) সকালে। ১৫ ই নভেম্বর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পর, যিনি নিজের সমাজ মাধ্যম সময়সারণী (Facebook Timeline)’তে লিখেছিলেন, “আমাদের শেষ আইকনও আজ না ফেরার দেশে চলে গেলেন! এই অভিশপ্ত ২০২০ কত কি যে ছিনিয়ে নিলো তার ইয়ত্তা নেই!” আজ সকালে, মেদিনীপুর বাসী প্রিয় হায়দার বাবু’র প্রয়াণের খবর শুনেও হয়তো একথাই উচ্চারণ করবে, কারণ, মেদিনীপুরের ‘সঙ্গীতগুরু’ জয়ন্ত সাহা’র সুযোগ্য ছাত্র ও শিষ্য হায়দার বাবু’ও যে তাঁর সঙ্গীতেরর মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের মনের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছিলেন।

thebengalpost.in
চলে গেলেন হায়দার আলী (৫২) :

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সপ্তাহ তিনেক আগে কোভিড আক্রান্ত হয়ে কলকাতার সিএমআরআই (CMRI HOSPITAL, KOLKATA) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। শিক্ষক ও সমাজসেবী সুদীপ কুমার খাঁড়া জানালেন, “চব্বিশ দিন আগে, কোভিড নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন কলকাতায়। প্রথমদিকে, স্বল্প উপসর্গযুক্ত ছিলেন। শুনেছি, ক্রমেই শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। সংক্রমণ ছড়িয়ে গিয়েছিল ফুসফুসে। আর ফিরলেন না! আমরা শোকস্তব্ধ, মেনে নিতে পারছিনা!” মেদিনীপুর শহরের বর্তমান শিল্প ও সংস্কৃতি জগতের অন্যতম পুরোধা পুরুষ ছিলেন হায়দার আলী। ছিলেন, মেদিনীপুর ‘রবীন্দ্র নিলয় স্মৃতি সমিতি’র সাংস্কৃতিক বিভাগের সম্পাদকও। সৃজনশীল মনন আর পরিশীলিত চেতনায় শহরের শিল্প ও সংস্কৃতি জগতকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করে গেছেন, শেষ দিন পর্যন্ত! গত ১৯ শে অক্টোবর (২০২০) নিজের পিতৃসম ‘সঙ্গীতগুরু’ জয়ন্ত সাহা’র প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ঐকান্তিক ভালোবাসা নিবেদনের প্রচেষ্টা স্বরূপ এক সঙ্গীতসন্ধ্যার আয়োজন করেছিলেন। অনুষ্ঠান সফল হওয়ায় ‘গুরু’ জয়ন্ত সাহা’কে সঙ্গে নিয়ে নিজের সমাজ মাধ্যম সময়সারণী’তে ছবি ও অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন। মেদিনীপুরের সাংস্কৃতিক জগতের অন্যতম মুখ এবং হায়দার বাবু’র ঘনিষ্ঠ বাচিক শিল্পী শুভদীপ বসু বললেন, “এও কি সম্ভব, সত্যিই আমরা শোকস্তব্ধ, ভাষাহীন! অসুস্থ হওয়ার কয়েকদিন আগেও কথা হয়েছে। তাঁর মতো শিল্প, সংস্কৃতি সঙ্গীতপ্রেমী এবং অবশ্যই ‘গুরু’র প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, আমি আমার সামান্য এই জীবদ্দশায় দেখিনি! ‘গুরু’ যে পিতারই এক রূপ, তিনি দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, জীবনের শেষ অনুষ্ঠানের (একক জয়ন্ত সাহা সঙ্গীতানুষ্ঠান) মধ্য দিয়েও। গতকাল থেকে অবস্থার অবনতি হওয়ায়, পরিবারের তরফে স্থানান্তরিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেই সুযোগটা দিলেন না!” আর, তাঁর ‘সঙ্গীতগুরু’ জয়ন্ত সাহা ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বলার মতো সাহস হয়ে ওঠেনি এই কঠিন সময়ে! এখনও কথা বলার সুযোগ হয়ে ওঠেনি, হায়দার বাবু’র স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাদের সাথেও। ভারাক্রান্ত মন আর বেদনার্ত হৃদয়ে তাঁরা সকলেই হয়তো উচ্চারণ করে চলেছেন, “যেতে আমি দিব না তোমায়। তবুও সময় হল শেষ, তবু হায়, যেতে দিতে হল!”

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে