কোভিডের সেই মারণ উপসর্গতে চিকিৎসা শুরুর আগেই মৃত্যু হল খড়্গপুর গ্রামীণের সুস্থ-সবল ব্যক্তির, শালবনীতে‌ পৌঁছলেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা

Death by the dangerous Symptoms of Covid, the specialists are reached at Salboni

THEBENGALPOST.IN
জেলায় ফের করোনা সংক্রমিত ১৬০ জন :
.

মণিরাজ ঘোষ, খড়্গপুর, ২৬ সেপ্টেম্বর: মারণ ভাইরাস নভেল করোনা বা কোভিড নাইনটিন (Covid 19)। অনেকেই একে, মারণ ভাইরাস বলতে রাজি নন, মৃত্যু’র হার মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ বলে (ভারতে ২ শতাংশ, সারা বিশ্বে ৪ শতাংশ প্রায়)! তবে, যে ভাইরাসের সংক্রমণে মাত্র ৬ মাসের মধ্যে সারা বিশ্বে প্রায় ১০ লক্ষ (সরকারিভাবে) মানুষ মারা যান, আর ৩ কোটির বেশি মানুষ (এখনো পর্যন্ত) সংক্রমিত হন, তাকে মারণ ভাইরাস বা সেই পরিস্থিতি’কে ‘মহামারী’ রূপে স্বীকার না করার বাস্তবসম্মত কারণও বোধহয় খুঁজে পাওয়া যায় না! সর্বোপরি, সারা বিশ্ব তথা আমাদের দেশ এবং রাজ্যের প্রত্যেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞই প্রথম থেকে একটা বিষয়ে একমত, তা হল, কোভিড সংক্রমিত হলে, হঠাৎ করেই শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা হু হু করে কমতে পারে! উপসর্গহীন বা স্বল্প উপসর্গযুক্ত যাঁদের ক্ষেত্রে তা হয় না, তাঁরা যেমন সৌভাগ্যবান, ঠিক তেমনই উপসর্গযুক্ত বা স্বল্প উপসর্গযুক্ত দের মধ্যে ৩ থেকে ৫ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটছে, সারা বিশ্ব, দেশ, রাজ্য এবং আমাদের জেলাতেও! এক্ষেত্রে, দ্রুত অক্সিজেন বা ভেন্টিলেশন পাওয়া গেলে রিকভারি করছেন বা সুস্থ হয়ে উঠছেন ২ থেকে ৩ শতাংশ মানুষ। কিন্তু, ১ থেকে ২ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে, সেই চরম দুর্ঘটনাই ঘটছে! শুধুমাত্র পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ক্ষেত্রে, এখনো পর্যন্ত ১৪৪ টি (২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারিভাবে মৃত্যু’র সংখ্যা, জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী) মৃত্যু’র ঘটনায় অন্তত ১০০ টি ক্ষেত্রে, পরিবার-পরিজনদের বক্তব্য, তাঁরা ভাবতেই পারেননি, তাঁদের আত্নীয় মারা যাবেন! চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য আধিকারিকেরা অন্তত ৫০-৬০ টি ক্ষেত্রে বলেছেন, দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি বা অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে, রেস্পিরাটরি ফেলিওর বা শ্বাসযন্ত্র বিকল হয়ে রোগী মারা গেছেন। এক্ষেত্রে, করোনা হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগী’র ক্ষেত্রে যেমন তা ঘটেছে, হাসপাতালে পৌঁছতে পৌঁছতেও ঘটেছে, আবার বাড়িতেও একই ঘটনা ঘটেছে। একেবারে সুস্থ বা স্বল্প উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে বা হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু হলেও, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রেসপিরেটরি ফেলিওর বা শ্বাসযন্ত্র বিকল হয়েছে। ঘাতক, কোভিড ১৯ ভাইরাস, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমিয়ে দিয়ে, সরাসরি ফুসফুসের উপর আক্রমণ হেনেছে! আজ (২৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাতেও, দায়ী সেই ‘মারণ’ উপসর্গই! খড়্গপুর গ্রামীণের জকপুর এলাকার চকগণেশপুরের মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি (৫০) আজ দুপুর পর্যন্ত সুস্থই ছিলেন বাড়িতে। দুপুর ২ টোর পর শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ায়, প্রথমে খড়্গপুর মহকুমা হাসপাতালের সেফ হোমে তাঁকে নিয়ে যান পরিজনেরা। কিন্তু, সেখানে উপসর্গহীন ও স্বল্প উপসর্গযুক্তদের চিকিৎসা হয়, তাই অক্সিজেন যুক্ত অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁরা লেভেল ফোর শালবনী’তে রেফার করেন। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, শালবনী করোনা হাসপাতালে ঢোকার দু-তিন কিলোমিটার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়!

THEBENGALPOST.IN
চিকিৎসা শুরুর আগেই মৃত্যু কোভিড সংক্রমিতের :

.

পরিবার সূত্রে জানা গেল, গত কয়েকদিন আগে পেশায় পুরোহিত (সঙ্গে, চাষবাসও করতেন) এই মানুষটির সাধারণ জ্বর হয়। স্থানীয় চিকিৎসককে দেখিয়েও কাজ না হওয়ায়, খড়্গপুরের একজন সুপরিচিত চিকিৎসককে দেখান। তিনি অক্সিজেন পরিমাপ করতে গিয়ে দেখেন একটু কম। তাই, প্যারাসিটামল জাতীয় কিছু ওষুধ দেওয়ার সাথে সাথে, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যেতে বলেন। গতকাল দুপুরে, মেদিনীপুর মেডিক্যালে কলেজে ভর্তির আগে, প্রথমে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হয়। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই রিপোর্ট পজেটিভ আসে। মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ আয়ুশ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। সেখানে বলা হয়, জ্বর ছাড়া সেরকম কিছু উপসর্গ নেই, তাই বাড়িতেই এই ধরনের ওষুধ খেয়ে থাকতে পারেন। রোগী নিজেও বলেন, আগের থেকে সুস্থ আছেন। ‌সাহস করে, রোগীকে বাড়ি নিয়ে যান পরিজনেরা। প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেয়ে, বাড়িতে আজ (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর পর্যন্ত সুস্থই ছিলেন। তারপরই হঠাৎ করে শারীরিক অবস্থার সামান্য অবনতি, তারপর এই চরম দুর্ঘটনা! স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তান (একজন কলেজ পড়ুয়া ও একজন স্কুল পড়ুয়া)’কে রেখে অকালেই চলে গেলেন, খড়্গপুর লাগোয়া জকপুরের (চকগণেশপুর গ্রামের) এই ব্যক্তি! তাঁর ভাই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’কে দোষারোপ করতে গিয়েও, নিজেদের তথা সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্যের কথাই বললেন, “আমাদের সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য, হঠাৎ করেই যদি এক একটা পরিবারে এরকম ঘোর বিপদ নেমে আসে! কি করব, কাকে দোষারোপ করব! চিকিৎসার অভাবে চলে যেতে হল আমার দাদাকে! স্বাস্থ্যকর্মীদের অবস্থাটা বুঝতে পারলেও, এই সিস্টেমটার উপর তো রাগ হচ্ছেই। বাড়ি থেকেও যখন নিয়ে এলাম, তখনো ভাবতে পারিনি, এরকম ঘটে যাবে! সব আমাদের কপাল!”

THEBENGALPOST.IN
কোভিডের ভয়াবহ উপসর্গতেই মৃত্যু বারবার (প্রতীকী ছবি) :

.

এদিকে, আজ দুপুরে যথাসময়ে শালবনীতে পৌঁছেছেন বাঙুরের বিশেষজ্ঞদল।‌ ১৪ জনের এই দলটি আপাততো, চ্যাংশোল (শালবনী বাজার থেকে ৫ কিলোমিটার) এলাকায় অবস্থিত, ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের একটি ট্রেনিং সেন্টারে (ARTI) আছেন। কাল সকাল থেকে ডিউটি শুরু করবেন বলে জানা গেছে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে। আজ, ট্রেনিং সেন্টারের গেস্ট হাউসে তাঁদের স্বাগত জানান, জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ নিমাই চন্দ্র মন্ডল। এদিকে, আজ বিকেলে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একটি দলও শালবনীতে পৌঁছেছে বলে সূত্রের খবর।

.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে