“কোনো মন্ত্রীর যোগ দেওয়ার খবর নেই, একাধিক বিধায়ক যোগাযোগ করেছেন”, মেদিনীপুরে বললেন দিলীপ ঘোষ, “শুভেন্দু ঠিকঠাকই আছে”, বললেন শিশির অধিকারী

.

দ্য বেঙ্গল পোস্ট বিশেষ প্রতিবেদন, সমীরণ ঘোষ, ২ নভেম্বর: আগামী ৫ ও ৬ নভেম্বর রাজ্যে আসছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ৫ ই নভেম্বর, রাঢ়বঙ্গ জোন এবং মেদিনীপুর-হুগলি জোনের সঙ্গে বাঁকুড়ায় বৈঠক করবেন তিনি। তারই প্রস্তুতি মিটিং বা আলোচনা সভা উপলক্ষে এবং বিজয়া সম্মিলনী’তে যোগ দিতে, রবিবার মেদিনীপুর ও খড়্গপুর শহরে এসেছিলেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি তথা মেদিনীপুরের সাংসদ দিলীপ ঘোষ। মেদিনীপুরে একটি সাংবাদিক বৈঠক করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর সম্পর্কে জানানোর সাথে সাথে, উপস্থিত সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তরও দিলেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছিল, শুভেন্দু অধিকারী’কে নিয়ে; কারণ, রাজ্য-রাজনীতিতে এই মুহূর্তে অন্যতম আলোচ্য বিষয় হল তাঁর আগামীদিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বা গন্তব্য! হয়তো সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে এনিয়ে একটু বেশিই আলোচনা হচ্ছে, তবে ‘ধোঁয়াশা’ রেখে দিচ্ছেন তিনি নিজেও! একবারও বলছেন না- “তৃণমূলে ছিলাম, তৃণমূলে আছি, তৃণমূলে থাকবো!” বলা তো দূরের কথা, ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ বা ‘মা মাটি মানুষের সরকার’ শব্দটিও মুখে আনছেন না। আক্রমণ করছেন না প্রধান বিরোধী দল বিজেপি কিংবা বাম-কংগ্রেসকেও! তবে, তাঁর বিজেপি’তে যাওয়া অথবা নতুন দল গড়া নিয়েই সবথেকে বেশি চর্চা চলছে। কিছু তো একটা তিনি নিজেও ভাবছেন, ভেবেছেন! সেজন্যই শনিবার (৩০ অক্টোবর) নন্দীগ্রামে বিজয়া সম্মিলনী ‘র মঞ্চ থেকে অনুগামীদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, “আমার মুখ থেকে কিছু না শোনা পর্যন্ত বাজারি খবর উপেক্ষা করুন!” ফলে, এটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ‘নিজের মুখেই’ নতুন কিছু বলবেন, পুরানো দলেই যদি থাকতেন, কিছু বলার প্রশ্নই উঠতোনা! অপরদিকে, রবিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ মেদিনীপুরে‌ বসে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, শুভেন্দু অধিকারী বা কোনও মন্ত্রীর যোগদান করার খবর তাঁর কাছে নেই। তবে বেশ কয়েকজন বিধায়ক যোগাযোগ করেছেন। দিলীপ বাবু বললেন, “বিধায়কদের লিস্ট তৈরি করা হচ্ছে। সংখ্যাটা আরো বাড়বে।” শুভেন্দু প্রসঙ্গে বলেন, “কোনো ভদ্রলোকই তৃণমূলে থাকতে পারবেন না! দলটাই উঠে যাবে। খুব তাড়াতাড়ি বিস্ফোরণ ঘটবে!” মেদিনীপুরে এদিন দুপুরে সাংবাদিক বৈঠকের আগেই অবশ্য কলকাতায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে রসিকতার সুরে বলেছিলেন, “শুভেন্দুকে দেখছি ওরা বিজেপিতে পাঠিয়েই ছাড়বে!” এরপর, দুপুর নাগাদ বিজেপি যুব মোর্চার রাজ্য সভাপতি সৌমিত্র খাঁ আবার বোমা ফাটিয়ে সরাসরি শুভেন্দু অধিকারী’কে বিজেপি’তে আহ্বান জানান, “পিসি-ভাইপোর দল ছেড়ে বিজেপি’তে আসুন।”

thebengalpost.in
মেদিনীপুরে দিলীপ ঘোষের সাংবাদিক বৈঠক :

.
.

এসবের মধ্যেই, রবিবাসরীয় রাজনীতিতে আরো তিনটি ইঙ্গিতপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে। প্রথমটি হল, পুরমন্ত্রী ফিরহাদ ববি হাকিম নাম না করেও একপ্রকার ‘সরাসরি’ শুভেন্দু অধিকারী কে পুনরায় আক্রমণ করেছেন। দ্বিতীয়টি হল, শুভেন্দু’র পিতা তথা সাংসদ ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলা তৃণমূলের সভাপতি শিশির অধিকারী র শুভেন্দু সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য এবং তৃতীয়টি হল, স্বয়ং শুভেন্দু অধিকারী’র হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদ কর্তৃক প্রকল্প উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে (সরকারি অনুষ্ঠানে) উপস্থিত থাকা। এবার, প্রথম ঘটনা প্রসঙ্গে আলোচনা করা যাক। নন্দীগ্রামে দাঁড়িয়ে শনিবার শুভেন্দু’র ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, “প্যারাশুটেও নামিনি, লিফটেও উঠিনি, সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে উঠেছি। ছোটোলোকেদের দিয়ে আক্রমণ করালেই ভেবেছে আমি উত্তর দেব! আমার লেভেল টা এতোটা নীচে নয়”, ফিরহাদের আঁতে বেশ ভালো ভাবেই ‘ঘা’ লেগেছে! তাই সাংবাদিক ডেকে তিনিও পাল্টা মন্তব্য করেছেন, “আমিও লিফটে উঠিনি, উনিও সিঁড়িতে ওঠেননি! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলনের হাত ধরে উঠেছি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেছনে আছেন বলেই বাংলার মানুষ আমাদের চেনে। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত।” এ থেকে এটুকু পরিষ্কার শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল থেকে এখন সত্যি সত্যিই অনেক দূরে! দ্বিতীয় আলোচনা শিশির অধিকারী’র মন্তব্য। রবিবার শিশির অধিকারী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, অমিত শাহ পূর্ব মেদিনীপুরে এসে কিছু করতে পারবেন না! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে দুটো উল্টোপাল্টা (গালিগালাজ) কথা বলেই বিদায় নেবেন! পূর্ব মেদিনীপুরে বিজেপির কোনো প্রভাব নেই, এখানে বিজেপি দাঁত ফোটাতে পারবেনা! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এখানে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। তিনি এও বলেন, “১৬ টি আসনের মধ্যে যে ২-১ টি আসনে আমরা কমজোরী আছি, ওটা মেকআপ করে নেব।” আর শুভেন্দু সম্পর্কে বলেন, “শুভেন্দু ঠিকঠাকই আছে, মাঝেমধ্যে ওকে দু-একজন উস্কে দিচ্ছে, নাহলে ও ঠান্ডা মাথার ছেলে, রাজনীতিটা বেশ ভালোই বোঝে! শুধু ও কেন, পূর্ব মেদিনীপুরের কোনো নেতাই বিজেপি’তে যাওয়ার মতো বোকামি করবেনা!” কিছুটা পরিষ্কার হল, শুভেন্দু অধিকারী’র বিজেপি তে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, আর গেলেও এখনও পর্যন্ত শিশির অধিকারী’র কাছেও সেই খবর নেই। তৃতীয় আলোচনা, রবিবার নন্দীগ্রাম ও সুতাহাটায় দুটি সরকারি অনুষ্ঠানে শুভেন্দু’র উপস্থিত থাকা। প্রসঙ্গত, তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার পরও, এমনকি পুজোর ঠিক আগেও শুভেন্দু অধিকারী সরকারি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছেন। তবে, সেগুলি ছিল পুলিশ প্রশাসনের অনুষ্ঠান। আর এদিন, হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদের অনুষ্ঠান। কাজেই এই সব অনুষ্ঠানে তিনি ‘জনপ্রতিনিধি’ হিসেবে উপস্থিত থাকতেই পারেন। এর সঙ্গে তৃণমূল বা অন্য কোনো দলের সম্পর্ক নেই! বরং এটা বলা যায়, তিনি এখনও জনপ্রতিনিধি, আগামী দিনেও জনপ্রতিনিধি হিসেবেই লড়াইয়ের ময়দানে থাকবেন। সেক্ষেত্রে, পুলিশ-প্রশাসন কিংবা এই ধরনের উন্নয়ন পর্ষদের সাথে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক বজায় রাখাটাকেই শ্রেয় বলে মনে করবেন যেকোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই। পরিবহন মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ছাড়াও, এদিনের ‘পথ বাতি’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান তথা বিধায়িকা ফিরোজা বিবি, উন্নয়ন পর্ষদের প্রশাসক পি হরিশঙ্কর প্রমুখ। সুতাহাটার অনুষ্ঠানে ছিলেন, সাংসদ দিব্যেন্দু অধিকারীও। এদিন শুভেন্দু অধিকারী মঞ্চ থেকে বলেন, “২০১১ সালে রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদ নন্দীগ্রামের ১৭ টি অঞ্চল জুড়ে ধারবাহিকভাবে যে বহুমুখী উন্নয়নমূলক কাজ করছে, সেই কাজে সংযোজিত হল এই পথবাতি। মাসে মাসে এই পথবাতির জন্য প্রয়োজনীয় বিলের টাকা হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদ দেবে।” তিনি আরও বলেন, “এই এলাকায় আমার অনেক দিনের যাতায়াত। হয়তো প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে আমাকে পাওয়া যায় না। কিন্তু, আমার দায়িত্ববোধ আছে যে কখন কখন আসতে হয়। কখন মানুষের কাছে পৌঁছতে হয়।” শুভেন্দু অধিকারী আরও বলেন, “আপনাদের সেবক শুভেন্দু আপনাদের পাশে ছিল, আছে, আগামীদিনেও থাকবে। আমাদের সময়ে অনেক কাজ হয়েছে, আরও কাজ করতে হবে।” আর এ থেকেও পরিষ্কার, তিনি রাজনীতির ময়দানে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। এই মুহূর্তে তিনি একটি রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত বিধায়ক কিংবা মন্ত্রী হিসেবে কিভাবে অস্বীকার করবেন, তিনি বা তাঁর দল মানুষের জন্য যেসব কাজ করেছেন। বরং, বিধায়ক বা মন্ত্রী হিসেবে নিজের সাফল্যের কথাই তুলে ধরবেন, কারণ, ভবিষ্যতেও তিনি বিধায়ক (জনপ্রতিনিধি অর্থে) বা মন্ত্রীই থাকতে চাইবেন, সেটা যে দলই হোক না কেন! আর সর্বোপরি, তৃণমূল কংগ্রেস বা দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব টা নেহাতই “মনোমালিন্য” বা “মতবিরোধ” সম্পর্কিত। এর সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক নেই বা কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির প্রশ্নও নেই। যদিও ইদানিং ফিরহাদ ববি হাকিম বা অখিল গিরির সৌজন্যে তাও শুরু হয়ে গেছে!

thebengalpost.in
নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারী (ফাইল ছবি) :

.

সবমিলিয়ে, শনিবাসরীয় ও রবিবাসরীয় রাজনীতি থেকে এটুকু ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, শুভেন্দু অধিকারী রাজনীতির ময়দানে যেরকমভাবে ছিলেন, তার থেকেও দ্বিগুণ শক্তি ও মানুষের আশীর্বাদ-ভালোবাসা নিয়ে থাকতে চাইছেন। তবে, কোন ‘দল’ তা এখনও স্পষ্ট করেননি, স্বয়ং শিশির অধিকারীও জোর দিয়ে বলতে পারেননি, “শুভেন্দু তৃণমূলেই থাকছে”, শুধু বলেছেন, “বিজেপিতে যাওয়ার মতো বোকামি করবেনা!” তার মানেই একটা বড় প্রশ্ন চিহ্ন! অপরদিকে, শুভেন্দু বলেছেন, “আমাদের আমলে অনেক কাজ হয়েছে, আরো অনেক কাজ করতে হবে।” “আরো অনেক কাজ” যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের নেতৃত্বেই করতে হবে, তা পরিস্ফুট করেননি! এদিকে, ১০ নভেম্বর নন্দীগ্রামের ঐতিহাসিক সভার ডাক দিয়েছেন। সেখানে আর একবার নিজের শক্তিপরীক্ষা করে নিতে চান বলেই মনে করা হচ্ছে! আর একটি বিশ্বস্ত সংবাদ সূত্র জানাচ্ছে, ১৭ নভেম্বরের পর শুভেন্দু তাঁর নিরাপত্তাকর্মী’দের তাঁর সঙ্গে থাকতে নিষেধ করে দিয়েছেন; অর্থাৎ সহজ বাংলায় বললে, তিনি আর সরকারি নিরাপত্তা নেবেন না! এই সূত্র যদি সঠিক হয়, শুভেন্দু অধিকারী বিধায়ক ও মন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করতে চলেছেন, নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যেই। আর জানুয়ারিতেই হয়তো নতুন দল নিয়ে মাঠে নামতে চলেছেন! সেই দল, বিজেপি, তৃণমূল বা বাম-কংগ্রেস কার সাথে জোট বাঁধবে, সেটা হয়তো ভবিষ্যতই নির্ধারণ করবে। এর বাইরেও অবশ্য অন্যান্য সম্ভাবনা নিশ্চয়ই থেকে যায়, কারণ রাজনীতিতে ‘অসম্ভব’ বলে কিছু নেই! বাম আর ডানের যদি জোট হতে পারে, তবে ‘দিদি’ আর ‘দাদা’র মিলন কিংবা বিচ্ছেদ দুইই সম্ভব! তবে এটুকু নিশ্চিত, নভেম্বরেই নাটকীয়তার অবসান ঘটতে চলেছে।

.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে