স্বাস্থ্য দপ্তরের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও উপযুক্ত ও যথেষ্ট সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবেই সমস্যা শালবনীতে, কাজ শুরু বিশেষজ্ঞদের, আলোচনা আধিকারিকদের সঙ্গে

THEBENGALPOST.IN
শালবনী করোনা হাসপাতাল :
.

মণিরাজ ঘোষ, শালবনী (পশ্চিম মেদিনীপুর), ২৭ সেপ্টেম্বর: পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার একমাত্র লেভেল ফোর করোনা হাসপাতাল শালবনী ‌সুপার স্পেশালিটি। আর, এই মুহূর্তে জেলার করোনা যুদ্ধে, বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু’তেও সেই শালবনীই! গত জুন মাসে, (২০২০) করোনা হাসপাতাল হিসেবে পথচলার শুরুতেই অবশ্য নানা ‘বিক্ষোভ’ ও ‘বিতর্ক’ এর মুখোমুখি হতে হয়েছিল শালবনী’কে। তারপরও, ১৭ জুন ২০২০ থেকে ১০০ টি শয্যা নিয়ে সাফল্যের সাথে এগোনো শুরু করেছিল‌ শালবনী। মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে, ২২ শে জুন এক শিশুকন্যা (৫ বছর বয়সী) সহ একসাথে ৭ জনকে করোনা মুক্ত করে নজিরও গড়েছিল! তবে, সেই সময় জেলার করোনা চিত্র নিঃসন্দেহে এই পর্যায়ের ছিল না! শালবনীতে ভর্তি থাকতেন বড়জোর ৩০-৪০ জন‌ করোনা আক্রান্ত। জেলায় সবমিলিয়ে সেইসময় সংক্রমিত ছিলেন ২০০-২৫০ জন (রাজ্যের হিসেবে ৩৩৮)। মৃত্যু হয়েছিল, বড়জোর ৫-৬ জনের (রাজ্যের তালিকায় ৩)। স্বাভাবিকভাবেই, সুস্থ ও সুন্দরভাবে পরিষেবা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন শালবনীর সীমিত সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মীরা। ক্রমে, সারা রাজ্য তথা জেলা জুড়ে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতির দাবি মেনে, শালবনীতে শয্যা সংখ্যাও বেড়েছে ক্রমান্বয়ে। ১৩০, ১৪৪, ১৭০, ১৯০ থেকে এখন আইসিসিউ,‌ এইচডিইউ সহ ২০২ টি। তবে, সেই অনুপাতে বাড়েনি, উপযুক্ত এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা! সর্বোপরি, জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত এই এলাকার বা মফস্বলের গ্রুপ-ডি কর্মী থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ‘সংক্রমণ’ নিয়ে একপ্রকার ভীতি ও আতঙ্কও হয়তো কাজ করেছে! চিকিৎসা পরিষেবাতেও সেই প্রভাব পড়েছে। প্রতিদিন মৃত্যু হয়েছে, এক থেকে একাধিক করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির। পরিবার-পরিজন থেকে শুরু করে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া রোগী এবং জেলার সচেতন নাগরিকদের তরফ থেকে বারবার অভিযোগ উঠেছে, করোনা সংক্রমিত রোগীদের প্রতি অবহেলা এবং কর্তব্যে গাফিলতির। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয়, জেলা থেকে রাজ্য অবধি নড়ে যায়! রাজ্য থেকে পাঠানো হয় প্রতিনিধি দল। উদ্যোগী হয় জেলা প্রশাসন ও জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরও। দায়িত্ব দেওয়া হয় নতুন সুপার’কে, কিছু স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়, শালবনীর স্থায়ী চিকিৎসক ছাড়াও, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকদের সর্বক্ষণের জন্য ডিউটি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সর্বোপরি, আজ (২৭ সেপ্টেম্বর) থেকে এম আর বাঙুরের ১৪ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল সরাসরি চিকিৎসা পরিষেবায় নিয়োজিত থেকে, ‘হ্যান্ড হোল্ডিং সাপোর্ট’ বা হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। চলবে ২ রা অক্টোবর (২০২০) পর্যন্ত। মেদিনীপুর মেডিক্যালের অধ্যক্ষ ডাঃ পঞ্চানন কুন্ডু’র জারি করা বিজ্ঞপ্তি মেনে, শালবনী করোনা হাসপাতাল ক্যাম্পাসের মধ্যে কোয়ার্টারে থাকা শুরু করেন মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক দলও। এছাড়াও, জেলা প্রশাসন ও জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের তৎপরতা, সর্বক্ষণ প্রতিটি বিষয় পর্যবেক্ষণ বা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা এবং সুপারের মাধ্যমে যথাযথ সমন্বয় রাখার চেষ্টা চলছে অত্যন্ত কার্যকরীভাবে। তা সত্ত্বেও, শালবনীতে একসাথে প্রায় ২০০ জনকে (মোটামুটি ভাবে প্রতিদিনই ভর্তি থাকেন ১২০ থেকে ১৬০ এর মধ্যে) সঠিক পরিষেবা দেওয়ার জন্য, উপযুক্ত বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, দক্ষ এবং যথেষ্ট সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী’র অভাব প্রকট! সর্বোপরি, এখনো বিভিন্ন মহলের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব বিদ্যমান। তাই, জেলা প্রশাসন, জেলা স্বাস্থ্য দফতর ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, কিছু সমস্যা বা ত্রুটিমুক্ত পরিষেবার অভাব থেকেই যাচ্ছে!‌ কলকাতার বিশেষজ্ঞ দলের নজরেও হয়তো পড়ছে সেই সমস্ত ত্রুটি বা খামতি। স্বয়ং, জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ নিমাই চন্দ্র মন্ডল জানিয়েছেন, “বাঙ্গুরের বিশেষজ্ঞদল সঠিক চিকিৎসা পরিষেবার বিষয়টি অত্যন্ত নিপুণভাবে শিখিয়ে দিচ্ছেন, হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। হাসপাতালের সুপার সহ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন। তা সত্ত্বেও, স্বাস্থ্যকর্মীদের আরও তৎপর হওয়ার অনুরোধ জানাবো। মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ থেকে যে চিকিৎসক বোর্ড ডিউটি করতে আসছেন, তাঁদের সাথেও সুপারের বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের একটি সুষ্ঠু সমন্বয় প্রয়োজন। যাতে, রোগীদের জরুরি প্রয়োজনে তাঁদের পাওয়া যায়। সেরকমই নির্দেশ আছে। আর, উপযুক্ত সংখ্যক সিস্টার বা নার্সের অভাবতো রয়েইছে! আইসিসিউ (ICCU), এইচডিইউ (HDU) এবং জেনারেল বেড মিলিয়ে অন্তত ৫০-৬০ জন নার্স থাকা প্রয়োজন, আছে মাত্র ২৩ জন। বিষয়টি নিয়ে জেলাশাসক ডঃ রশ্মি কমল নিজেও উদ্যোগী হয়েছেন। আমরা, রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর বা স্বাস্থ্য ভবন’কেও বিষয়টি জানিয়েছি। তবে, যে সমস্ত স্বাস্থ্য কর্মী ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা আছেন, তাঁদের কাছে আমরা বারবার আবেদন জানাচ্ছি, মহামারীর এই পরিস্থিতিতে মানুষকে সঠিক ও আন্তরিক পরিষেবা দেওয়ার জন্য। তাঁরা সেই বিষয়ে উদ্যোগী হবেন বলে জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে, পরিস্থিতি অনেকটা বদলেছে। সুপার ডাঃ দাস আন্তরিকভাবে প্রত্যেকের সাথে সমন্বয় রেখে চলে চলার চেষ্টা করছেন।”

THEBENGALPOST.IN
শালবনী করোনা হাসপাতাল :

.

এদিকে, লেভেল ফোর শালবনী করোনা হাসপাতালে, সঠিক পরিষেবা প্রদানের বিষয়ে, আজ বিকেলে এম আর বাঙুরের বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠক করেন, জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ নিমাই চন্দ্র মন্ডল, উপ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক (১) ডাঃ সৌম্যশঙ্কর সারেঙ্গী, মেদিনীপুর সদর মহকুমাশাসক দীননারায়ণ ঘোষ প্রমুখ। বৈঠকে, শালবনীর পরিষেবা ত্রুটিমুক্ত করা নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানিয়েছেন, মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ও উপ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক। এরই মধ্যে, আজ বিকেলে হাসপাতালের চুক্তিভিত্তিক বা এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত গ্রুপ-ডি সাফাই কর্মী’রা নিজেদের দাবি নিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য বিক্ষোভ দেখান। তবে, তাঁরা কাজ বন্ধ ও পরিষেবা বন্ধ রাখেননি! তাঁদের মূল অভিযোগ, তাঁদেরকে স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, অথচ উপযুক্ত বেতন দেওয়া হচ্ছে না। ২০০ টি শয্যার হাসপাতাল হলেও, ১৫০ শয্যার হাসপাতালের বেতন দেওয়া হচ্ছে। অবিলম্বে, তাঁদের সঠিক বেতন ও বোনাস সহ বিভিন্ন বিষয়গুলি নিয়ে ভাবা হোক! এই বিষয়ে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ নিমাই চন্দ্র মন্ডল জানিয়েছেন, “ওনাদের এজেন্সির সাথে যেভাবে চুক্তি হয়েছিল, সেইমতো আমরা বেতন প্রদান করছি। শয্যা বেড়েছে ঠিকই তবে, হাসপাতালের পরিসর বা আয়তন বৃদ্ধি পায়নি। একই জায়গাতে কয়েকটি শয্যা বাড়ানো হয়েছে মাত্র, এজন্য খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয়! তবে, তাঁদের ন্যায্য দাবিগুলি প্রশাসন নিশ্চয়ই ভেবে দেখবে। তার আগে ওনাদের প্রত্যেককে সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোনো পক্ষেরই কর্তব্যে গাফিলতি মেনে নেওয়া হবেনা।” হাসপাতালের সুপার ডাঃ নবকুমার দাস জানিয়েছেন, “প্রত্যেক চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের নিয়ে অত্যন্ত আন্তরিক ভাবে এই করোনা যুদ্ধ মোকাবিলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে, স্বাস্থ্যকর্মীদের অপ্রতুলতার বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছি।”

THEBENGALPOST.IN
শালবনী করোনা হাসপাতালের পরিষেবা নিয়ে তৎপরতা (ফাইল ও প্রতীকী ছবি) :

.
.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে