সামান্য সামর্থ্য আর সুবিশাল হৃদয় নিয়ে মানবসেবায় নিয়োজিত দম্পতির পাশে দাঁড়াল সেই ‘মেদিনীপুর ছাত্রসমাজ’, করোনা কিংবা আমফানে যারা সমান সচল

Advertisement

মণিরাজ ঘোষ, মেদিনীপুর, ১৪ জুন : শোষিত, লাঞ্ছিত, নিপীড়িত শ্রমিক-মজুর-কৃষকের প্রাণের কথা যে কবিতায় ব্যক্ত হয়, ‘কবিগুরু’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই “দুই বিঘা জমি” ( রচনা: ১৩০২, ৩১ শে জৈষ্ঠ্য) কবিতাটির আজ ১২৫ তম সৃষ্টি-বর্ষ। কবিতায় বঞ্চিত উপেন সব হারিয়েও নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিল এই বলে, “মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে, তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল, দু বিঘার পরিবর্তে!” আর, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার রাধামোহনপুর স্টেশন থেকে তিন কিমি দূরে কাঁকড়াপুঞ্জি গ্রামের মৃণাল দাস ও তাঁর স্ত্রী শ্রাবন্তী মিশ্রের কাছ থেকে কেউ কিছু কেড়ে নেয়নি ঠিকই, কিন্তু, নিজেদের যৎসামান্য সামর্থ্য নিয়ে লকডাউনের প্রথম দিন থেকে যেভাবে অসহায়-অভুক্তদের মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছেন, তাতে উপেনের মতোই এই সুবিশাল পৃথিবী আর বিশ্ব মানবলোকের ডাক যে তাঁরা হৃদয়ে উপলব্ধি করেছিলেন, সে কথা বলাই বাহুল্য!

Advertisement
দ্য বেঙ্গল পোস্ট
রাধামোহনপুর স্টেশন মৃণাল ও শ্রাবন্তী’র অন্নসত্র :

মৃণাল বাবু একজন ধূপ কাঠির ব্যবসায়ী, লকডাউনের জন্য স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায় মন্দা এবং তাঁর স্ত্রী শ্রাবন্তী স্থানীয় আশাকর্মী। কিন্তু, মানবসেবায় নিজেদের নিয়োজিত করার ক্ষেত্রে নিজেদের পুঁজি কিংবা পিছুটান’কে শুধুমাত্র তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে, নেমে পড়েছিলেন পথে। পরবর্তী সময়ে, সেই পথেই (মানবসেবার পথে) তাঁদের অনেক সাথী (সহায়তাকারী) এসে যোগ দিয়েছেন। রাধামোহনপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম বা কাছাকাছি বাসস্ট্যান্ডে আশ্রয় নেওয়া অভুক্ত, অন্ন-হীন, ভবঘুরে ২০-২৫ জন অসহায় মানুষ জীবন ধারণ করতো ট্রেন বা বাসের উপর নির্ভরশীল হয়ে। শাক-পালা, গেঁড়ি-গুগলি বিক্রি করে বা সামান্য কিছু বিক্রি বাটা করে এবং চেয়ে চিন্তে তাদের কোনদিন ভর-পেট আবার কোনদিন অর্ধেক পেট খাওয়ার জুটতো। সেই অসহায় মানুষগুলোর জন্য লকডাউনের মধ্যে তিনবেলার খাওয়ারের আয়োজন করে ঈশ্বরের দূত হিসেবে পৌঁছে যান মৃণাল ও শ্রাবন্তী। বাড়ি থেকে তিন কিমি অতিক্রম করে , প্রতিদিন তিন বার (অর্থাৎ সকাল, দুপুর, সন্ধ্যায়) খাওয়ার নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছিলেন তাঁরা। কিন্তু, লকডাউন ক্রমশ বাড়তে থাকায় তাদের পক্ষে এই ‘অন্নসত্র’ চালিয়ে যাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে! পরবর্তী সময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, কিছু সহৃদয় মানুষ। তারপর, এখনো পর্যন্ত বাস-ট্রেন সেভাবে না চলায়, আবার অসুবিধার মধ্যে পড়েন তাঁরা! এবার তাঁরা আবেদন করেন, অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার অন্যতম প্রসিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘মেদিনীপুর ছাত্রসমাজ’ এর কাছে। পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের কর্মী সংগঠনের সাহায্য নিয়ে, তাঁরা হাত বাড়িয়ে দেন, এই মানবপ্রেমিক দম্পতির মহান কর্মসূচি সফল করতে।

দ্য বেঙ্গল পোস্ট
অন্ন পরিবেশন :

মেদিনীপুর ছাত্রসমাজ’ এর অন্যতম প্রধান কান্ডারী, সভাপতি কৃষ্ণগোপাল চক্রবর্তী বললেন, “এই মুহূর্তে ছাত্রসমাজের কাছে ২৫ জন মানুষের এক মাসের জন্য তিন’বেলা খাদ্যের সংস্থান করার উপযুক্ত খাদ্যসামগ্রী মজুত ছিলনা! তাই আমরা আবেদন করি, পাঞ্জাব ন্যাশানাল ব্যাঙ্কের কাছে। বরাবরের মতোই তাঁরা আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে, স্টেশনের এই অভুক্ত মানুষগুলির জন্য একমাসের খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন। আর সেই খাদ্যসামগ্রী নিয়ে গতকাল মেদিনীপুর ছাত্রসমাজ রওনা দিয়েছিল রাধামোহনপুর রেলস্টশনের উদ্দেশ্যে। আমাদের কোষাধ্যক্ষ কৌশিক কঁচ, সুকান্ত অট্ট, শুভ ঘোষ, কৌস্তভ দাস, শান্তনু গায়েন, সঞ্জয় দাস, মৃত্যুঞ্জয় দাস, দেবাশীষ বাগ প্রমুখেরা গতকাল এই অভিযানে অংশগ্রহন করেন। ধন্যবাদ জানাই পাঞ্জাব ন্যাশানাল ব্যাঙ্কের সকল কর্মকর্তা সহ আজকের অভিযানের সকল কান্ডারীকে। অন্তর থেকে স্যালুট জানাই শ্রাবন্তীদি ও মৃণালদা’কে।”

দ্য বেঙ্গল পোস্ট
খেজুরীতে ছাত্রসমাজ :

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, করোনা অতিমারী’র ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে সারা লকডাউন জুড়ে মানব সেবায় নিয়োজিত থাকার পর, আমফান দুর্গতদের কাছেও ত্রানসামগ্রী নিয়ে তিন দফায় পৌঁছে গেছেন মেদিনীপুর ছাত্রসমাজের সদস্যরা। খেজুরী ও তৎসংলগ্ন এলাকার মৎস্যজীবীদের খটিগুলি ছাড়াও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় তাঁরা পৌঁছে দিয়েছেন ত্রিপল ও খাদ্যসামগ্রী।