নদীর বুক খালি করে অবাধে চলছে বালি উত্তোলন, গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ঘর-বাড়ি, কৃষি-জমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ

Advertisement

দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, মেদিনীপুর, ১২ জুন : লকডাউন শিথিল হয়েছে, মানুষ ফের রুজি-রোজগারের টানে স্বাভাবিক কর্মজীবন শুরু করতে চলেছে, করোনা আতঙ্ক পিছনে ফেলে। এদিকে, লকডাউন শিথিল হতে না হতেই, বালি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্যও ফের বেড়েছে। কংসাবতী নদীর দুই তীরে বেপরোয়া বালি খাদান খুলেছে বালি মাফিয়ারা। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মেদিনীপুর সদর ব্লকের ধেড়ুয়া, গোয়ালডাঙ্গা, আলামপুর, নিশ্চিন্তপুর, উপরডাঙ্গা, ভাটপাড়া, লোহাটিকরী, মনিদহ , কঙ্কাবতী, নেপুরা পর্যন্ত বৈধ ও অবৈধ বালি খাদান দুইই চলছে। নদীর আরেক তীরে ঝাড়গ্রাম জেলার অন্তর্গত বৈতা থেকে শুরু করে শুকজোড়া, মানিকপাড়া, আমদই সহ একাধিক বালি খাদান থেকে বোঝাই করা গাড়ির জন্য রাস্তা তৈরি হয়েছে। সর্বমোট কংসাবতীর বুকে ১০০টির বেশি বালিখাদান চলছে।

Advertisement
দ্য বেঙ্গল পোস্ট
ট্রাক্টরে করে বালি পাচার :

সূর্য অস্ত যাওয়ার ঠিক কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্রমিকদের নিয়ে মাফিয়ারা পৌঁছে যাচ্ছে বালির সন্ধানে। রাতের অন্ধকারে আলো জ্বালিয়ে জেসিবি সহ নামিদামি মেশিন দিয়ে নদীর বুক খালি করে দিচ্ছে অবাধে। রাতভর ট্রাক্টর দিয়ে বালি বোঝাই করে বড় বড় গাড়িতে আনলোড হচ্ছে এবং কাছাকাছি ডিপো গুলিতে পৌঁছে যাচ্ছে বালি। অবৈধভাবে যত্রতত্র বালি জমা করার অভিযোগও উঠছে। পাশাপাশি, বৈধ খাদানের সঙ্গে অবৈধ খাদানগুলি থেকেও চলছে অবাধে ইনকাম। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, পুলিশ প্রশাসনের চোখে ফাঁকি দিয়ে বৈধ খাদানের সিও দেখিয়ে অবৈধ খাদানগুলি অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে বালি মাফিয়ারা। গ্রামবাসীদের আরো অভিযোগ, সামনেই গুড়গুড়িপাল থানা, তোয়াক্কা না করেই বেপরোয়াভাবে রাতের অন্ধকারে হচ্ছে জেসিবি দিয়ে বালি তোলা আর তারপর বেপরোয়াভাবে রাস্তা দিয়ে চলছে বালি গাড়ি। রাস্তাঘাটেরও বারোটা বেজে যাচ্ছে বলে অভিযোগ গ্রামবাসীদের। মেদিনীপুর সদর ব্লকের গোপগড় থেকে কঙ্কাবতী পর্যন্ত পিচ রাস্তার অবস্থা খুবই বেহাল! পুরো রাস্তা খানাখন্দে ভর্তি। বালি বোঝাই গাড়ির জন্য সমস্যায় পড়ছেন নিত্যযাত্রীরাও।

দ্য বেঙ্গল পোস্ট
নদীর গ্রাসে কৃষি জমি :

তবে, সবথেকে মারাত্মক যে অভিযোগ তা হল, নিষ্ঠুরভাবে উন্নত সব মেসিন দিয়ে নদীগর্ভ খালি করার কারণে, নদীর গতিপথের পরিবর্তন হয়ে যাওয়া। নদী পাড় বিধ্বস্ত হচ্ছে, প্রতিবছর সামান্য বর্ষাতেই জল পৌঁছে যায় দুকূল ভাসিয়ে। ফলে, অসহায় কৃষকদের ফসল ভরা কৃষি জমি আর আধপেটা মেঠো পরিবারগুলির ঘর-বাড়ি ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা! সামনেই আসছে বর্ষা! তার উপর আমফানের প্রভাবে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা তো আছেই! ভোট এলেই রাজনৈতিক নেতাদের আশ্বাস বাঁধ মেরামতের কাজে আমরা হাত লাগাব। ভোট কেটে যাওয়ার পরে দেখা নেই তাঁদেরও। এই ভাবেই দিন চলছে গরিব খেটে খাওয়া মানুষদের।  গ্রামবাসীরা চাইছেন, বালি তোলা হোক বৈধভাবে, অবৈধ খাদান বন্ধ হোক, জেসিবি মেশিন দিয়ে বালি তোলা অবিলম্বে থামানো হোক, বালি গাড়ি ও বিভিন্ন মেশিনের বেপরোয়া যাতায়াত বন্ধ হোক! মণিদহ গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান অঞ্জন বেরা’র কথাতেও সেই সুর, “মানুষের সমস্যার কথা বারবার তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। জেসিবি দিয়ে রাতের অন্ধকারে যেভাবে নদী গর্ভ খনন করা হচ্ছে, সত্যিই নদীর গতিপথের পরিবর্তন হচ্ছে! এটা একটা ভয়ঙ্কর সমস্যা। বৈধ খাদান থেকে নিয়ম মেনে বালি তোলা হোক, কিন্তু এই বিষয়ে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের উদাসীনতাও আছে‌। সঠিকভাবে খাদানগুলি চিহ্নিত করে দেওয়া প্রয়োজন। আর জনবহুল রাস্তা দিয়ে দিনের বেলাতেও ভারি ভারি মেসিন পত্র আর গাড়ি চলাচল বন্ধ হওয়া উচিত। তবে এই বিষয়ের সুষ্ঠু সমাধানে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।” জেলার ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের আধিকারিক তথা অতিরিক্ত জেলাশাসক এই মুহূর্তে বদলি হয়ে যাওয়ার কারণে, দপ্তরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি; তবে জেলা পরিষদের ভূমি কর্মাধ্যক্ষ নেপাল সিংহ বললেন, “অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। এর আগেও অভিযোগ পেয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে প্রশাসনের তরফে। আগামী সোমবার ওই এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার কথা ভেবেছি।”

দ্য বেঙ্গল পোস্ট
নদীর একদিকের পাড় বিধ্বস্ত :

দিনকয়েক আগেই, সংবাদমাধ্যমের ফোন পেয়ে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে এবং মেদিনীপুর সদর ব্লকের বিডিও ফারহানাজ খানম বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন। তবে সে যাত্রায় বৈধ খাদানের সিও (ক্যারিং অর্ডার) দেখিয়ে রেহাই পান অভিযুক্তরা। গুড়গুড়িপাল থানার পুলিশের বক্তব্য ছিল, “দুটো জেলার খাদান চলছে। ঝাড়গ্রামের মানিকপাড়ার দিক থেকেও গাড়ি ঢুকছে। তবে এদিকের ক্ষেত্রে যথাযথ অভিযোগ পেলেই আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।”

অপরদিকে, ঝাড়গ্রামের মানিকপাড়া থানার পক্ষ থেকে বলা হয়, “এই বিষয়ে যা বলার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলবে।” ঝাড়গ্রামের জেলাশাসক আয়েশা রানী এ’র সঙ্গেও এই বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। ব্যস্ত থাকার জন্য তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

দ্য বেঙ্গল পোস্ট
অবাধে বালি উত্তোলন :