তিন পড়ুয়ার আন্তরিক ইচ্ছে আর অভিভাবকদের সহায়তায় হাতিবাড়ী-জামশোলা চেকপোস্টে অসুবিধায় পড়া পরিযায়ীদের আহার বিতরণ

Advertisement

করোনা পরিস্থিতিতে, লকডাউনের এই সুগভীর সংকটকালে সমস্যায় সমগ্র দেশের মানুষ! তবে, সবচেয়ে বেশি সমস্যায় বোধহয় পরিযায়ী শ্রমিকরাই। মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন অনেকেই। অনেক ক্ষেত্রে তাদের যাত্রাপথে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও সাধারণ মানুষ। গত মঙ্গলবার ওড়িশা-বাংলা সীমান্তে, পরিবার পরিজনের সাহায্য নিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ালো লকডাউনের ফলে গৃহবন্দী থাকা তিন পড়ুয়া।

Advertisement

করোনার কারণে, গত ২৪ শে মার্চ মধ্যরাত থেকে গোটা দেশে শুরু হয়েছে লকডাউন। তারও বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হোষ্টেলগুলো। তাই এই সময় বেশির ভাগ পড়ুয়াই রয়েছে নিজের গ্রাম বা নিজের শহরে। সেই কারণেই, ব্যাঙ্গালোরের জ্যোতিনিবাস কলেজের এমসিএ’র ছাত্রী সুদীপ্তা বালা ও মেদিনীপুর সররকারি পলিটেকনিকের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সুদীপ বালা নিজেদের গ্রামের বাড়ি ঝাড়গ্রাম জেলার গোপীবল্লভপুর থানার আমরদা গ্রামে রয়েছে। অন্যদিকে স্কুল বন্ধ হওয়ায়, দিন কয়েকের জন্য বাবা-মায়ের সাথে মামাবাড়ি বেড়াতে এসে লকডাউনে আমরদাতেই আটকে রয়েছে মেদিনীপুর শহরের বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠ গার্লস হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী সম্প্রীতি খাঁড়া। সুদীপ বালা ও সুদীপ্তা বালা সম্প্রীতির মা’ এর মামাতো ভাই-বোন, এরা সম্পর্কে সম্প্রীতির মামা ও মাসী। এখন এরা একই গ্রাম আমরদাতে অবস্থান করছে।
কয়েকদিন ধরে টিভি চ্যানেলে পরযায়ী শ্রমিকদের দুরবস্থার খবর এদের মনকে নাড়া দেয়। তাছাড়া সপ্তাহ খানেক ধরে, তারা দূর থেকে লক্ষ্য করেছে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে পাকা রাস্তা দিয়ে বাস যাচ্ছে।তাই, তারা পরিকল্পনা করে ফেলে ওড়িশা থেকে জামশোলা-হাতিবাড়ী সীমান্ত দিয়ে যে সব পরিযায়ী শ্রমিকরা বাংলায় ঢুকছে তাদের কিছু জনকে তারা অন্তঃত একবেলা খাওয়াবে। সেইমতো তারা পরিকল্পনার কথা জানায় তাদের বাবা-মা, দাদু-দিদাদের। এদের পরিকল্পনায় সায় দেন, সুদীপ্তা,সুদীপের বাবা-মা সুকুমার বালা ও দীপা বালা এবং ঠাকুমা নীহারিকা বালা।সায় দেন সম্প্রীতির বাবা-মা সুদীপ কুমার খাঁড়া ও মৃণ্ময়ী খাঁড়াও। এগিয়ে আসেন সম্প্রীতির মামাদাদু দিলীপ কুমার ভূঞ্যা, মামাদিদি মৃদুলা রানী ভূঞ্যা ও মামা দিব্যকান্তি ভূঞ্যা। সেইমতো মঙ্গলবার দুপুর থেকে শুরু হয় আয়োজন। ঠিক হয় জনা পঞ্চাশেক পরিযায়ী শ্রমিকদের তাঁরা আটার রুটি ও তরকারি খাওয়াবেন।

বিকেলে হাতিবাড়ী চেক পোস্টে গিয়ে খবর নিয়ে জানা যায়, এদিন আর কোন শ্রমিকের ওড়িশা থেকে বাংলায় ঢোকার সম্ভাবনা কম। সন্ধ্যা ৭ টার আগে চেকপোস্টের পক্ষে বলা অসুবিধা, এদিন চেকপোস্টে ক’জন পরিযায়ী শ্রমিক আসবেন। এখবর শুনে মন খারাপ হয় পড়ুয়াদের। কিন্তু প্রস্তুতি চলতে থাকে। ৭ টার আগেই মা-দিদাদের সাহায্য নিয়ে তৈরি হয়ে যায় প্রায় ২০০ পিস আটার রুটি। অন্যদিকে বন্ধু তপন গরাইয়ের সাহায্য নিয়ে আলু, পটল, সোয়াবিন দিয়ে তরকারি তৈরির ব্যবস্থা করে ফেলেন সম্প্রীতির মামা দিব্যকান্তিবাবু। সন্ধ্যা ৭ টায় হাতিবাড়ী চেকপোস্ট ও পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকে জানা যায়, বাংলার এপারে এদিন সন্ধ্যায় কোন শ্রমিক আসেননি। চিন্তায় পড়ে যায় পড়ুয়ারা। শেষমেষ পুলিশ প্রশাসন মারফত খবর আসে, বাংলার ৩৭-৩৮ জন শ্রমিক এদিন হাতিবাড়ী সংলগ্ন ওড়িশার জামশোলাতেই আটকে রয়েছেন। তাদেরকে খাবার দেওয়া যেতে পারে। ইতিমধ্যে, আম্ফানের প্রভাবে আকাশের মুখভার এবং মাঝে মাঝে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তারাই মাঝে চল্লিশ জনের জন্য রুটি-তরকারী প্যাকিং হয়ে যায়। দুর্যোগ মাথায় নিয়েই মোটরবাইকে প্রতিবেশী নীরোধবরণ ভূঞ্যাকে সাথে নিয়ে খাবার সহ আমরদা থেকে ছ কিমি দূরের হাতিবাড়ী চেকপোস্টের উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করেন সম্প্রীতির বাবা শিক্ষক সুদীপবাবু। শেষমেষ একজন সিভিক ভলান্টিয়ার ও চেকপোস্টে থাকা পুলিশ কর্মীদের সহযোগিতায় ওড়িশা পুলিশের হাতে খাবার হস্তান্তর করেন সুদীপবাবুরা। মোবাইল মারফত আমরদায় এ খবর পৌঁছাতেই পড়ুয়াদের মন খুশিতে ভরে ওঠে। মনে একরাশ তৃপ্তি নিয়ে আমরদার দিকে পা বাড়ান সুদীপবাবু ও নীরোধবরণ বাবুরা।