দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ৯ মে: গত চব্বিশ ঘণ্টায় সামান্য কমল করোনা সংক্রমণ। শনিবার ৫৫৯ এর পর রবিবার সংক্রমিত হলেন ৪৮৩ জন। গত ৪৮ ঘন্টায় সংক্রমিত ১০৪২ জন। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের রবিবার সকালের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত চব্বিশ ঘণ্টায় সংক্রমিত হয়েছেন ৪৮৩ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের (শনিবারও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল)। দু’দিনে জেলায় সরকারিভাবে ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য কিছুটা আশঙ্কায় রেখেছে জেলাবাসীকে। বিশ্বস্ত সূত্রের খবর অনুযায়ী, মেদিনীপুর শহরের ৩ জন যুবক, গড়বেতার এক যুবতী, খড়্গপুরের ১ জন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি (পেশায় শিক্ষক)’র মৃত্যু হয়েছে গত ৪৮ ঘন্টার মধ্যে! গত ৭ দিনে জেলায় মোট সংক্রমিত হলেন- ৩২৭৬ (২৩০, ৩৬৪, ৫৭৭, ৫৮৮, ৫৭৫, ৫৫৯, ৪৮৩) জন।

গত চব্বিশ ঘণ্টায় মেদিনীপুর সদর শহরে লাগামছাড়া সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। মোট ১৮০ জন সংক্রমিত হয়েছেন। এর মধ্যে সদর এলাকায় ১৫ জন (বাগডুবি, বেড়াপাল, কলসীভাঙা, বেলিয়াশোল, দেউলডাঙা, কালগাঙ প্রভৃতি এলাকায়) এবং মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে ১৫ জন। এছাড়াও, পুলিশ লাইনের ৫ জন করোনা যোদ্ধা এবং ১ জন ডেপুট মেজিস্ট্র্যাট করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। বাকি ১৪৪ জন মেদিনীপুর পৌরসভার বাসিন্দা। আবাস, কুইকোটা, সিপাই বাজার, মির্জাবাজার, হবিবপুর, নজরগঞ্জ, স্কুলবাজার, রাঙামাটি, অশোকনগর, তাতিগেড়িয়া, বিধাননগর, শরৎপল্লী, রবীন্দ্রনগর, রাঙামাটি, অরবিন্দ নগর, মহতাবপুর, ধর্মা, পাটনা বাজার, বার্জটাউন প্রভৃতি এলাকায় ভয়াবহ গোষ্ঠী সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। এই সব এলাকা থেকে ১০ থেকে ২০ জন করে করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। মির্জাবাজার, নজরগঞ্জের, আবাস, কুইকোটা ও সিপাই বাজারের অবস্থা মারাত্মক। প্রতিদিন গড়ে সংক্রমিত হচ্ছেন ২০ জন করে। অন্যদিকে, জগন্নাথ মন্দির, বল্লভপুর, তোড়াপাড়া, তলকুই, মাইকেল মধুসূদন নগর থেকেও এদিন একাধিক ব্যক্তি করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। অপরদিকে, গত চব্বিশ ঘণ্টায় খড়্গপুরে করোনা সংক্রমিত হয়েছেন, ৯৫ জন। এর মধ্যে, আইআইটি খড়্গপুরের ১০ জন, রেল সূত্রে ২২ জন এবং খড়্গপুর গ্রামীণের ১২ জন। বাকি ৫১ জন শহর খড়্গপুরের। অন্যদিকে, শনিবার ৪০ জনের পর শালবনীতে করোনা সংক্রমণ বেশ কিছুটা কমল! রবিবার সংক্রমিত হয়েছেন ১৪ জন। এর মধ্যে, বিআরবি বা টাঁকশালে ২ জন, তিলাবনী ও জামবনীতে যথাক্রমে ১ জন করে, শালবনী গ্রামীণ হাসপাতালের ২ জন এবং শালবনী বাজার ও সংলগ্ন এলাকায় ৮ জন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়াও, সবং এলাকায় ৬ জন, পিংলায় ৩ জন এবং ডেবরা ব্লকে ১৩ জন জন করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। বেলাদায় ৮ জন, দাঁতনে ১১ জন, কেশিয়াড়িতে ১০ জন ও কেশপুরে ৪ জন করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। গড়বেতার তিনটি ব্লক মিলিয়ে ৩৪ জন ও ঘাটাল মহকুমায় ৭৫ জন সংক্রমিত হয়েছেন গত চব্বিশ ঘণ্টায়।

গত, ৪৮ ঘন্টায় ১০ জনের মৃত্যু কিছুটা দুঃশ্চিন্তায় রেখেছে জেলাবাসীকে। এই তালিকায় থাকা কয়েকজন যুবকের মৃত্যু স্তব্ধ করে দিয়েছে মেদিনীপুর শহরবাসীকে। গত ১৭ ই এপ্রিল করোনা সংক্রমিত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল ৪৩ বছর বয়সী কুন্তল মুখার্জি’র। মেদিনীপুর শহরের মানিকপুর এলাকার বাসিন্দা, পেশায় ঠিকাদার কুন্তল সপরিবারে করোনা সংক্রমিত হয়েছিলেন গত ৪ ঠা এপ্রিল। তাঁর স্ত্রী, ১৩ বছরের পুত্র এবং সত্তরোর্ধ্ব বাবা সুস্থ হয়ে ফিরলেও, ফিরতে পারেননি কুন্তল! গত ১৭ ই এপ্রিল কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। কুন্তলের দেখাশোনা যিনি সবথেকে কাছে থেকে করেছিলেন, তিনি কুন্তলের ভগিনীপতি অতনু পাল। পেশায় ব্যবসায়ী বছর ৩৮ এর অতনু ও তাঁর স্ত্রী (কুন্তলের বোন) ও করোনা আক্রান্ত হয়ে মেদিনীপুর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কিন্তু, গত এক সপ্তাহ আগে স্ত্রী সুস্থ হয়ে উঠলেও, অতনুর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে প্রতিদিনই। তাঁদের দু’জনেরই চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক (বিভিন্ন কারণে নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না) জানিয়েছেন, “অতনু বাবু’র স্ত্রী’কে অত্যন্ত সঙ্কটজনক অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারলেও, তাঁর অবস্থা প্রতিদিন খারাপ হতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে, ওনার পরিবার প্রায় ১৫ দিন ধরে ভর্তি থাকা বেসরকারি হাসপাতাল থেকে অন্য আর একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার ঝুঁকি নিয়ে ফেলেন। তাতে আমর অনুমতিও ছিলনা, কারণ রোগীকে স্থানান্তরিত করার মতো শারীরিক অবস্থা ছিলনা। সেই বেসরকারি হাসপাতালেও সবরকম ভাবে চেষ্টা করি, কিন্তু ব্যর্থ হই। মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সব শেষ হয়ে যায়! কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কোভিড- ১৯ এতটাই প্রাণঘাতী হামলা করছে, কোনোভাবেই বাঁচানো যাচ্ছেনা। তবে, প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে আমরা সফল হতে পারছি। আর এবারই এটা বেশি দেখা যাচ্ছে যে, করোনা ভাইরাস যেকোনো বয়সের এবং সুস্থ মানুষকেও কাবু করে ফেলছে সহজেই। নতুন এই ইন্ডিয়ান ভেরিয়েন্ট সত্যিই মারাত্মক। সকলে সাবধানে থাকুন।” অন্যদিকে, মেদিনীপুর শহরের মাত্র ২৫-২৬ বছর বয়সী এক যুবকেরও মৃত্যু হয়েছে শনিবার। জগন্নাথ মন্দির এলাকার বাসিন্দা ওই যুবক গত কয়েকদিন আগে করোনা সংক্রমিত হয়ে শালবনী করোনা হাসপাতালে ভর্তি হয়। প্রথম থেকেই শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল ওই যুবকের। অবস্থার অবনতি হলে, মাত্র ২ দিন আগে তাকে মেদিনীপুর শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও অবস্থার অবনতি হওয়ায়, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের HDU ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেখানেই ওই যুবকের মৃত্যু হয় শনিবার। অন্যদিকে, মেদিনীপুর শহরের বড়বাজারের এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর ৪০ বছরের যুবক পুত্রেরও মৃত্যু হয় শনিবার। শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল ওই যুবক। তবে, ওই দুই যুবকেরই (জগন্নাথ মন্দির ও বড়বাজার) কিছু কো-মর্বিডিটি ছিল বলে জানা গেছে। শনিবার শালবনী করোনা হাসপাতালে মাত্র ২৫ বছরের এক তরুণীর মৃত্যু হয়। গড়বেতার বাসিন্দা ওই তরুণীরও কিছু কো-মর্বিডিটি ছিল বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। যদিও জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। তবে, সতর্ক থাকা প্রয়োজন! বিশেষত বয়স্ক ও কো-মর্বিডিটি থাকা ব্যক্তিদের সচেতনতা অবলম্বন জরুরি। গত চব্বিশ ঘণ্টায় জেলার করোনা হাসপাতাল গুলি থেকে ৫১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন বলে জানা গেছে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে।








