বৌমার উপর ‘দেবীর ভর’! তারপর থেকেই গড়বেতার সাহা বাড়িতে শুরু হয় লক্ষ্মী পুজো

.

পলাশ খাঁ, গড়বেতা (পশ্চিম মেদিনীপুর), ২৮ অক্টোবর: বৌমার উপর ধনদেবীর ভর! আর তা দেখেই নিজের বাড়িতে মা লক্ষ্মীর আরাধনা শুরু করেন গড়বেতার গদাধর সাহা। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতার খড়কুশমা একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। এই গ্রামেই বাস করতেন গদাধর সাহা। জমি জায়গার অভাব ছিল না। ফলে, জমিতে চাষাবাদ করেই সংসার চালাতেন৷ স্ত্রী আর দুই পুত্র’কে নিয়ে সংসার। দুই পুত্র নারায়ণ ও ফকির। দুই পুত্রের বিয়েও দিয়ে দেন তিনি। ফকির সাহার বিয়ে হয় বিজন বালা সাহার সঙ্গে। বিজন বালা ছিলেন অপরুপা সুন্দরী ও খুব করিৎকর্মা। একা হাতেই সংসারের পুরো দায়িত্ব সামলাতেন। এক শরতে আগমনির সুর বেজে উঠেছে। মাঠে মাঠে সবুজের সমারোহ। ধানের আগায় বিন্দু বিন্দু শিশিরের প্রলেপ। ঠিক এমনই এক সন্ধ্যায়, বাড়িতে বসে সবাই যখন পুরানো দিনের গল্পে মশগুল, সেই সময় হঠাৎ করেই বিজন বালা দেবী’র উপর মা লক্ষ্মীর ‘ভর’ করেন (বা, অবচেতন মনে দর্শন দেন) বলে কথিত। প্রথমে বাড়ির সকলেই হতচকিত হয়ে পড়েন! পরে মা লক্ষ্মী স্বয়ং ভরে বার্তা দেন, তাঁর আরাধনা করার। সেই দিন রাত্রেই গদাধর সাহা যখন ঘুমোচ্ছিলেন, সেই সময় দেবী তাঁকেও ফের স্বপ্নে দেখা দিয়ে, নিজের বাড়িতে তাঁর আরাধনার কথা জানান৷ স্বপ্নের ঘোরেই তিনি দেখেন যে- চারিদিকে যেন আলোর রোশনাইয়ে ভরে উঠেছে! বাজছে শাঁখ, কাঁসর ঢোল সানায়ের বাদ্য৷ সকালে উঠেই তিনি পরিবারের বাকি সদস্যদের কাছে তাঁর রাত্রের স্বপ্নের কথা জানালে, সেদিনই সকলে মিলে মনোস্থির করেন নিষ্ঠাভরে বেবীর আরাধনার বিষয়ে।

বৌমার উপর দেবী’র ‘ভর’! তারপর থেকেই পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতার সাহা বাড়িতে শুরু হয় লক্ষ্মী পুজো :

.
.

এদিকে, হাতে সময় কম থাকায় তাড়াতাড়ি ছুতোর ডেকে প্রতিমা বানিয়ে বাড়ির উঠোনেই পুজো শুরু হয়। পরের বছর আলাদাভাবে বাঁশ খড় দিয়ে মন্ডপ বানিয়ে তাতে পুজো হয়। তার পর থেকে ওই মন্ডপেই পুজো হয়ে থাকে। বর্তমানে মন্দির সংস্কার করে মার্বেল পাথর বসানো হয়েছে। গদাধর সাহার মৃত্যুর পর তাঁর ছেলেরা পুজোর দায়িত্ব নেন। প্রায় একশ বছর ধরে এই ভাবেই পুজো হয়ে আসছিল। কিন্তু, ফকির সাহা ও নারায়ণ সাহার মৃত্যু হলে, তাঁদের ছেলেরা প্রতি বছর এক একজন করে পুজোর দায়ভার নিয়ে পুজো করতে শুরু করে। এই বছর পুজো ১২৬ বৎসরে পড়লো। পুজো পরিচালনা করার অন্যতম কান্ডারী ভোলানাথ সাহা জানান, আমাদের এই পুজো বিগত কয়েক বছর ধরে, পরিবার হিসেবে ভাগ করে পুজো করা হলেও আদতে সাহাদের পারিবারিক পুজো হিসেবেই প্রসিদ্ধ। এই পুজোতে পরিবারের সকল সদস্য যেমন একসঙ্গে পুজোর আনন্দে মেতে উঠে, তেমনই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সকলেই হাজির হয় পুজোর দিনে। তবে আমাদের পুজোর বিশেষত্ব হলো, আগে পরিবারের পারিবারিক সন্ন্যাসী বাবার পুজো হওয়ার পর লক্ষ্মী পুজো শুরু হয়। আর পুজো’তে ঢোল সানাইয়ের নহবতের সুরে ঘট ডোবানোর কাজ হয়৷ সেই ধারা বজায় রেখে সাহা পরিবারের সদস্যরা এখনো ঢোল সানাইয়ের নহবতের সুরে ঘট ডোবাতে যান। তবে, বর্তমানে এই করোনা অতিমারীর কারণে, এবার সেই পারিবারিক ঐতিহ্য কিছুটা শিথিল করা হয়েছে৷ নাম মাত্র কয়েকজন সানাই বাদক নিয়েই এবার ঘট ডোবানোর কাজ হবে। পরিবারের সদস্য সান্তনু সাহা বলেন, “আমাদের এই সাহা পরিবারের পুজো প্রতিবছর বারি (পালা) করে পালিত হয়। এবার পুজোর বারি পড়েছে আমাদের৷ চারদিন ধরে এই পুজোতে যেখানে পরিবারের সকল আত্মীয়স্বজন আসতেন এবার তা হচ্ছে না! আর যারা উপস্থিত থাকবেন তাদের প্রত্যেকের মাস্ক অবশ্যই থাকবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পুজো অর্চনা হবে৷ প্রতিদিন মন্ডপ স্যানিটাইজ বা জীবাণুমুক্ত করা হবে।” খড়কুশমার সাহাদের পরিবারের এই লক্ষী পুজো সাহা পরিবারের হলেও, বর্তমানে তা গ্রামের সকলের পুজো হয়ে উঠছে। সাহাদের এই পুজোতে গ্রামের মানুষের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতোই।

thebengalpost.in
গড়বেতার সাহা বাড়ির লক্ষ্মী পুজো :

.
.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে