ডেপুটি স্পিকারের দেহ সৎকারে বাধা! নজিরবিহীন বিক্ষোভ থামল জমি-দানে, হল দাহ

.

দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, ঝাড়গ্রাম, ৩০ অক্টোবর : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার তথা ঝাড়গ্রামের বিধায়ক সুকুমার হাঁসদার দেহ সৎকারকে ঘিরে নজির বিহীন বিক্ষোভ দেখল ঝাড়গ্রাম তথা সারা রাজ্য ও দেশ! সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৪ টা অবধি, প্রায় ৬ ঘন্টা দেহ পড়ে রইল, সাজানো চিতার সামনে, তাঁর নিজের জমিতেই। কিন্তু, দাহ করতে পারলেন না, গ্রামবাসীদের প্রবল বিক্ষোভের মুখে। বিক্ষোভে অন্য কেউ নয়, আদিবাসী সমাজই‌! নির্দিষ্ট শ্মশানে দাহ না করাতেই, বাধা দিলেন গ্রামবাসীরা। তাঁদের দাবি, কোন শর্তেই নিজেদের দাবি থেকে বা আদিবাসী সমাজের সিদ্ধান্ত থেকে তাঁরা সরে আসবেন না! অবশেষে, শ্মশানের জন্য জমি দান করে, প্রায় বিকেলে ৪ টা নাগাদ দাহ করার অনুমতি মিলল।

দ্য বেঙ্গল পোস্ট
শ্মশানে ডেপুটি স্পিকার সুকুমার হাঁসদার দেহ :

.
.

স্থানীয় সূত্রে জানা গেল, প্রয়াত সুকুমার হাঁসদার জন্মভিটে সাপধরা গ্রাম পঞ্চায়েতের দুবরাজপুর গ্রামে। নিজের গ্রামের শশ্মানে বা জন্মভিটেতে সৎকার না করে, পাশের রাধানগর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার জারালাটা মৌজায় নিজেদের ফাঁকা জমিতে দেহ সৎকার করার জন্য তাঁর পরিবার তোড়জোড় করে। তাই অন্য মৌজার মানুষ প্রতিবাদ করেন। এরকম স্থানে শ্মশান না থাকা সত্ত্বেও, কেনো দেহ করা হবে, সে যেই হোন না কেন! আদিবাসী জনজাতির সামাজিক রীতি অনুযায়ী, এমনই নজিবিহীন বাধা আসে। দাবি ওঠে, এই মৌজায় সৎকার করলে, সেই জায়গাকে শ্মশান হিসাবে স্বীকৃতি সহ তা সবার জন্য ব্যাবহার করতে দিতে হবে। সেই জটিলতার কারণে, দুই কাঠা জমি শ্মশান করার জন্য দেওয়ার কথা বলেন, প্রায়ত বিধায়ক সুকুমার হাঁসদার পরিবার। কিন্তু, দাবি ওঠে পুরো জমি শ্মশান করতে দিতে হবে! তাতে প্রথমে রাজি না হয়ে, একপ্রকার জোর করে চিতা সাজালে, এলাকার মানুষ সহ মহিলারা জলের বালতি নিয়ে তেড়ে আসে, চিতার স্থানে!

দ্য বেঙ্গল পোস্ট
গ্রামবাসীদের প্রবল বিক্ষোভের মুখে দীর্ঘক্ষণ পড়ে রইল বিধায়ক সুকুমার হাঁসদা’র দেহ :

.

প্রসঙ্গত, গতকাল (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায়, কলকাতা থেকে ঝাড়গ্রাম এসে পৌঁছয়, ঝাড়গ্রামের প্রয়াত বিধায়ক সুকুমার হাঁসদা’র মৃতদেহ। রাতে তাঁর দেহ ঝাড়গ্রাম শহরের রঘুনাথপুরের বাড়িতে ছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল, সকালে সাপধরা গ্রাম পঞ্চায়েতের দুবরাজপর গ্রামের দেশের বাড়িতে সৎকার ও পারলৌকিক কাজ হবে । কিন্তু, ছেলে সুরজিৎ হাঁসদা জানায়, পারলৌকিক কাজ ঝাড়গ্রামের বাড়িতে হবে। এ নিয়ে মতবিরোধ হয় বাড়ির লোকেদের সাথে । তারপরই জারালাটায় সৎকার করার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়! এদিকে, দুবরাজপুরে কাঠ নিয়ে যাওয়া কিংবা গান স্যালুটের আয়োজন প্রভৃতি সবকিছুই করা হয়েছিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে! কিন্তু, সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে সবকিছুই গণ্ডগোল হয়ে যায়। এ নিয়ে, তৃণমূল নেতৃত্বের মধ্যে একটা চাপা ক্ষোভ তৈরি হলেও, তা তাঁরা প্রকাশ করেননি, স্পর্শকাতর বিষয় বলেই। অপরদিকে, জারালাটা গ্রামের ক্যানেলপাড়ের কাছে সুকুমারের পরিবারিক জায়গা ছিল। সেখানেই তাঁকে সৎকার করার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, মূলত ছেলে সুরজিৎ হাঁসদা’র ইচ্ছেতে। দুপুরে জারালাটায় নিয়ে আসা হয় সুকুমারের মরদেহ। সঙ্গে জলসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী সৌমেন মহাপাত্র, রাজ্য সভার সাংসদ মানস রঞ্জন ভূঁইয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা তৃণমূলের সভাপতি অজিত মাহাতি, পশ্চিম মেদিনীপুরের সভাধিপতি উত্তরা সিংহ হাজরাও আসেন। ছিলেন- ঝাড়গ্রামের জেলাশাসক আয়েশা রানী এ, পুলিশ সুপার অমিত কুমার ভরত রাঠৌর, ঝাড়গ্রামের সভাধিপতি মাধবী বিশ্বাস এবং ঝাড়গ্রাম জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান বীরবাহা সরেন। সুকুমারের মৃতদেহ দাহ করার জন্য নিয়ে আসার পর, ঘটনাস্থলে কিছু আদিবাসী লোক জমায়েত হয়। তাঁরা মৃতদেহ সৎকারে বাধা দেন। ঝাড়গ্রামের আইসি, বিডিও, এসডিপিও দফায় দফায় আলোচনার মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করেন গ্রামবাসীদের। গ্রামবাসীরা দাবি করতে থাকেন, এখানে সৎকার করা হলে, এই জায়গাটিকে শ্মশান হিসেবে ঘোষনা করতে হবে। চিতায় মরদেহ তুলতেই তুমুল গন্ডগোল শুরু করেন জারালাটা গ্রামের বাসিন্দারা। তাঁরা চিতা থেকে কাঠ টেনে ফেলার চেষ্টা করেন। তাঁদেরকে আপাতভাবে শান্ত করে, পুলিশের পক্ষ থেকে গান স্যালুট হয়। তারপর, মৃতদেহ চিতায় তুলতেই ফের গন্ডগোল শুরু হয়। রাজ্যসভার সাংসদ মানস রঞ্জন ভূঁইয়া বলেন, “আমরা চাই, আদিবাসী সমাজকে কোন দুঃখ না দিয়ে তাঁদের কোন অসম্মান না করে পরিবার ও সমাজ এক হয়ে মিলিতভাবে কাজ করুক। আদিবাসী সমাজের রীতিনীতি এবং পারিবারিক সমস্যার মেলবন্ধন হয়ে গেলে সবটাই মিটে যাবে। এটা প্রশাসনের কোন ব্যাপার নয়। এই ব্যাপারটা হল একান্ত পারিবারিক ও আদিবাসী সমাজের।” এরপর, সুকুমার হাঁসদার পরিবার গ্রামবাসীদের পাঁচকাঠা জমি শ্মশান করতে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে, বিক্ষোভ বন্ধ হয়!

thebengalpost.in
প্রায় ৬ ঘন্টা পর সমস্যার সমাধান হয় :

.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে