দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১০ মার্চ: সাজা প্রাপ্তদের প্রত্যেকের বয়সই ৬০ এর বেশি! একজনের বয়স প্রায় ৭৫। নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অপরাধে এই বয়সেই তাঁরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করবেন। ৩৫
বছর আগের একটি খুনের মামলায়, আজ মেদিনীপুর জেলা আদালত ৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ জারি করল। সাজাপ্রাপ্ত এই ৯ জন আসামী হল যথাক্রমে- শেখ মেহবুব, শেখ ইলিয়াস, শেখ ইসান, আবেদ আলি, সেখ জালাল, সেখ আলাউদ্দিন, সেখ জিয়াউদ্দিন,
কুরবান আলি এবং রমজান আলি। প্রত্যেকেই ঘাটাল থানার রঘুনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা।

১৯৮৬ সালের ২৭ শে সেপ্টেম্বরের ঘটনা। পারিবারিক বিবাদের জেরে, এক বাড়ির তিন-চার জন মিলে পাশের বাড়ির একজনকে নৃশংস ভাবে মারধর করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় (২-৩ দিনের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়)!
এরপরের দিনই, আহত ব্যক্তির পরিবারের লোকজন এবং তাদের আত্মীয়-স্বজন রা মিলে, মারধর করা ওই পরিবারের উপর চড়াও হয়। ওই পরিবারের সদস্য বছর ৩৫ এর নুর ইসলাম এবং তার আরও দুই ভাই পেছনের গেট দিয়ে পালিয়ে যায়। নুরের বাবা,
মা, স্ত্রী’কে মারধর করে পিছু ধাওয়া করে, ১৬ জন ব্যক্তি। বাকি দুই ভাই ভরা নদী সাঁতরে পালিয়ে গেলেও, নুর পালাতে না পেরে স্থানীয় পাঁচু দোলইয়ের বাড়িতে ঢুকে পড়ে এবং মশারি জড়িয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে যায়। ১৬
জন মিলে তাঁকে খুঁজে বের করে এবং তাকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে। তলোয়ার দিয়ে হাত-পা কেটে ফেলা হয়। আঘাত করা হয় টাঙি দিয়েও। মৃত্যুর পর চোখ খুবলে বের করে নেওয়া হয়। এরপর কলা গাছের ছাল দিয়ে মুড়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয়,
স্থানীয় গোবরার খালে। কিছুদূর গিয়ে একটি গাছে আটকে গেলে ফের মৃতদেহ টি তুলে দেহ থেকে ধড় আলাদা করে, ভাসিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় ৭ দিন পর ১২ কিলোমিটার দূরে একটি গ্রাম থেকে পুলিশ ওই দেহ উদ্ধার করে। মৃতদেহ শনাক্ত করেন
নুর ইসলামের মা যাহেদা বিবি, বাবা আব্দুর রহমান এবং স্ত্রী সাফিয়া (যতন) বিবি। ঘাটাল থানায় লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা শুরু হয়। দরিদ্র পরিবার হওয়ায় নুর ইসলামের মা আলাদা করে আইনজীবী রাখতে পারেননি। সরকারি আইনজীবীদের
সহায়তায় এবং ২৬ জনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মামলা চলতে থাকে। প্রায় ১৭ বছর পর, ২০১৩ সালে আর্গুমেন্ট বা শুনানিপর্ব শেষ হলেও বিচারপতিরা সাজা শোনাতে গড়িমসি করছিলেন! এদিকে, ১৬ জন অভিযুক্তের মধ্যে ৭ জনের মৃত্যু হয়! অবশেষে
আজকে ফার্স্ট ট্র্যাক আদালতের তৃতীয় এজলাসের বিচারপতি উত্তম ভট্টাচার্য সাজা শোনালেন।

সরকারি আইনজীবী ছিলেন শেখ রজব আলী। তাঁর দুই জুনিয়র অ্যাডভোকেট বা আইনজীবী ছিলেন আজিজুল হক এবং টি. প্রমীলা। তাঁরা জানালেন, আসামীদের পক্ষে বড় বড় উকিলরা ছিলেন। এদিকে, ১৬ জন অভিযুক্তের ৭ জনের মৃত্যু হয়। অবশিষ্ট ছিল ৯ জন। তাদের সাজা শোনাতে বা এই মামলায় হাত দিতে বিচারপতিরা উৎসাহী ছিলেন না! যাকে বলে আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা! যাই হোক, এতবছর পর সরকারি আইনজীবীদের আবেদনে বিচারপতি উত্তম ভট্টাচার্যের এজলাসে নতুন করে এই মামলা তোলা হয়। বিচারপতি ভট্টাচার্য অবশিষ্ট ৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিলেন। তবে, জীবিত অবস্থায় এই রায় শুনে যেতে পারলেন না নুর ইসলামের মা জাহেদা বিবি এবং বাবা আব্দুর রহমান! তবে, স্বামীর হত্যাকারীদের সাজা শুনলেন নুরের স্ত্রী সাফিয়া (যতন)।
Whatsapp Group এ








