“তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই – কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই” , নতুন করে বাঁচতে শেখায় ২২ শে শ্রাবণ : বিশেষ প্রতিবেদন

.

দ্য বেঙ্গল পোস্ট বিশেষ প্রতিবেদন, মণিরাজ ঘোষ, ৭ আগস্ট : মৃত্যুঞ্জয়ী রবীন্দ্রনাথ জীবনের আলোকেই মৃত্যুকে দেখেছিলেন এক চির সত্য রূপে, বলেছিলেন- “মৃত্যুর চেয়ে নিশ্চিত ঘটনা তো নেই…!” জীবন অধ্যায়ের এই নিঠুর-কঠিন সত্যের ঢেউ রবি ঠাকুরের জীবন পটে বারেবারে আছড়ে পড়লেও, জীবনসৌন্দর্য, মর্ত্যপ্রীতি আর মানবপ্রেমের অন্তর্দর্শনে তা জয় করেছেন বারবার! ১৮৭৫ এ ১৪ বছর বয়সে মাতা সারদা সুন্দরী দেবী’কে হারানোটা ছিল, এক আবছা আলো-আঁধারি স্মৃতির ন্যায়; কিন্তু, ১৮৮৪’র ১৯ শে এপ্রিল একান্ত আপনজন, নিজেদের হাতে গড়া নন্দনকাননের স্বপ্ন-সুখের সাথী নতুন বউঠান কাদম্বরী’কে হারানো টাই রবি কবির জীবনে মৃত্যু-শোকের বা প্রিয়জন-বিচ্ছেদের প্রথম অভিঘাত! সদ্য বিবাহিত (১৮৮৩’র ৯ ডিসেম্বর) রবি’র হদয়াকাশ বেদনার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে গেলেও, প্রকাশ করেননি, ভেঙে পড়েননি; গড়ে তুলেছেন নিজেকে নূতন করে বউঠান কাদম্বরীর অন্তরাকাঙ্খিত কবি রবি রূপে। রবিও যে কথা দিয়েছিলেন, তাঁর নতুন বউঠানকে, “তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা, এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা।” না একে একে পত্নী মৃণালিনী দেবী (১৯০২), মধ্যম কন্যা রেনুকা (১৯০৩), পিতা দেবেন্দ্রনাথ (১৯০৫), কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ (১৯০৭), মধ্যম জামাতা সত্যেন্দ্রনাথ ও ভ্রাতুষ্পুত্র হিতেন্দ্রনাথ (১৯০৮), সর্বাপেক্ষা আদরের জ্যেষ্ঠ কন্যা মাধুরীলতা, ডাকনাম বেলা (১৯১৮) কে হারিয়েও কখনো পথ হারা হননি। বরং বার বার বলে উঠেছেন, “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।” একেবারে শেষ সময়ের কাব্যেও (জন্মদিনে, ১৯৪১) কবি উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে গেছেন, “আমি পৃথিবীর কবি, যেথা তার যত উঠে ধ্বনি, আমার বাঁশির সুরে সাড়া তার জাগিবে তখনই।” শিখিয়েছেন বাঁচতে, জীবনকে ভালোবাসতে। বিশ্বজগতের মাঝে ‘নিজের স্থান’ বা অস্তিত্ব’কে স্বীকার করে, ভয়শূন্য হৃদয়ে, উচ্চ শিরে জীবনের জয়গান গাইতে। তাইতো, প্রিয় পুত্র শমী মারা যাওয়ার পর নিজের জ্যেষ্ঠ কন্যা বেলার কাছে, অন্তরে শোক চেপে, এক অমোঘ দৃঢ়তায় বলেছিলেন, “যে রাত্রে শমী গিয়েছিল সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্ত্বার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক, আমার শোক তাকে একটুও পিছনে না টানে।” আবারো একবার উপলব্ধি করেছিলেন, “সবকিছুর” মধ্যেই সে আছে, তারা আছে, তিনি নিজে আছেন।

.
thebengalpost.in
পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও কন্যাদের (মাধুরী, রেনুকা, মীরা) সাথে রবীন্দ্রনাথ :

একবিংশ শতাব্দীর এই ভয়াবহ মহামারীর সংকটের মুখে, রবি প্রয়াণ দিবসে আরো একবার স্মরণ করে নেওয়া যায় যে, রবীন্দ্রনাথের দুই কন্যা রেণুকা (মাত্র ১৩ বছর বয়সে) ও মাধুরীলতা (৩২ বছর বয়সে)’র প্রয়াণ হয়েছিল টিবি বা যক্ষ্মা রোগে। আর, ১১ বছর বয়সে কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিল কলেরায় আক্রান্ত হয়ে। সেইসব রোগের প্রকোপ এখন আর নেই। কালের নিয়মে, সৃষ্টির স্রোতে প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। বৃদ্ধি পেয়েছে ক্যান্সার, হৃদরোগ প্রভৃতি জটিল রোগের প্রকোপ, এসেছে করোনা’র মতো মারণ অনুজীব! পরিবর্তনই নিয়ম, বিবর্তনই সত্য। তাই, এই অন্ধকারও একদিন কেটে গিয়ে নতুন আলো আসবে, সেই স্বপ্ন নিয়েই তো আজো আমরা বাঁচি। আর, সব জয় করে বেঁচে থাকার সেই স্বপ্ন দেখায় ২৫ শে বৈশাখ কিংবা ২২ শে শ্রাবণ; একে অপরের পরিপূরক। এক জগৎ থেকে অন্য জগতে পাড়ি দেওয়া। স্বয়ং তিনি (রবীন্দ্রনাথ) “শান্তম শিবম অদ্বৈত্যম” শুনতে শুনতে বিচিত্র ছলনাময়ী’র হাত ধরে‌ অক্ষয় শান্তিপারাবারে ডুব দিয়েছিলেন ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের (১৯৪১ এর ৭ আগস্ট) এই দিনটিতে, ঠিক এই সময়টিতে (দুপুর ১২ টা ১০ মিনিটে)। ইচ্ছে ছিল, সবুজের মাঝে, শান্তির মাঝে প্রিয় শান্তিনিকেতনেই বিলীন হবেন, সেই সাধটুকু হৃদয়ে অপূর্ণ থেকে যায়! নিজের জন্মভূমি জোড়াসাঁকোতেই মহামানবের মহাপ্রয়াণ ঘটে, অগণিত জনসমুদ্রের মধ্য দিয়ে তাঁর “সোনার তরী” পাড়ি দেয় অজানার উদ্দেশ্যে! আজো, শ্রাবণের অঝোর ধারায় কান পাতলেই রবি ঠাকুরের সকল ভক্ত শুধুই শুনতে পান, “তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই – কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই।”

.
thebengalpost.in
সম্পূর্ণ ইচ্ছের বিরুদ্ধে শান্তিনিকেতন থেকে জোড়াসাঁকোর পথে :

.

জেলা থেকে রাজ্য, রাজ্য থেকে দেশ প্রতি মুহূর্তের খবরের আপডেট পেতে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক বুক পেজ এবং যুক্ত হোন Whatsapp Group টিতে